বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২০   Thursday, 2 April 2020.  



 বাংলাদেশ


আমাদের প্রতিদিন

 Feb-23-2020 09:14:00 PM


 

No image


>> নেই লেখাপড়ার পরিবেশ

>> কর্মসংস্থান তৈরিতে নেই উদ্যোগ

>> পুষ্টিহীনতায় গর্ভবতীরা

>> নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা

আরিফা আয়শা:

বছরের পর বছর ধরে অবাঙালিরা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার থেকে। মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান। মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে তাদের জন্য নির্ধারিত কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো বসবাসের জন্য উপযুক্ত জায়গা। তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করার জন্য তৈরি হয়নি লেখাপড়ার পরিবেশ, কর্মসংস্থান তৈরিতে নেওয়া হয়নি কোন উদ্যোগ, পুষ্টিহীনতায় ভোগেন গর্ভবতী মায়েরা, ক্যাম্পগুলোতে নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এছাড়াও পরিবারের ৬-৭ জন সদস্যের জন্য বরাদ্ধ রয়েছে মাত্র একটি ঘর যার ফলে যাবতীয় চাহিদা মিটিয়ে অতিকষ্টে কোন রকম দিনাতিপাত করছেন এসব অবাঙালি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৪০বছর আগে বাংলাদেশে আগমন ঘটেছিল পাকিস্তানি নাগরিক নামে অবাঙালিদের কিন্তু এদেশে তারা পাইনি প্রত্যাদর্শীতা। তারা সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে সীমিত জায়গার মধ্যে গড়ে তুলেছে মাথা গোঁজার ঠাই। দীর্ঘদিন এদেশে থাকাতে তারা নিজেকে এখানকার নাগরীক বলে মনে করছেন। 

রংপুরে অবাঙালিদের জন্য রয়েছে ১১টি ক্যাম্প। আরডিসিসিএস রোডে অবস্থিত ২নং ইস্পাহানী ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে প্রায় দুইশ আশিটি পরিবার রয়েছে। চলাচলের জন্য রাস্তাগুলোও অনুপযোগী।

ক্যাম্পের ইনচার্জ তৈয়ব হোসেন বলেন, প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে ঘর সরকারিভাবে দেয়া হয়েছে। তবে একটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা হচ্ছে ছয় থেকে সাতজন, এতগুলো মানুষের একটি  ঘরে থাকা তাদের পক্ষে খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একটি ঘরের কারণে তারা ভালো ভাবে পড়ালেখা করতে পারছে না। শিশুদের লেখাপড়ার জন্য যে পরিবেশের প্রয়োজন তারা সঠিক ভাবে তা পাচ্ছে না। তিনি দুঃখের সাথে বলেন, এখানে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি।

ওই ক্যাম্পে বসবাসকারী ফাতেমা বেগম বলেন, এখানে আমরা অতিকষ্টে জীবন যাপন করছি, এখানে টয়লেট ও বাথরুম খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এই ক্যাম্পে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য টয়লেট রয়েছে বিশটি ও বাথরুম চারটি। এতগুলো মানুষের জন্য টয়লেট ও বাথরুমের প্রয়োজন আরো বেশি।

এই ক্যাম্পের অনেকে অভিযোগ করে বলেন, বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে সমস্ত বাড়ি ও ঘর পানি দিয়ে ভরে যায়, যার ফলে তারা ঘরে থাকতে পারে না, তাদের কাজকর্মের অসুবিধা হয় এবং তারা অনাহারে দিন কাটায়। এসব সমস্যার কারণে গর্ভবতী মায়েরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং টাকার অভাবে তারা ভালো কোনো ডাক্তারের চিকিৎসা করাতে পারে না, যার ফলে তাদের সন্তান শারিরীকভাবে অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী হয়। তারা বাসার সামনে দোকান দিয়ে সিঙ্গারা, পিয়াজি, পুরিসহ বিভিন্ন রকম জিনিস বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আবার কেউ কেউ রিক্সা চালায়, ভ্যান চালায় দিন মজুরী ও কাপড়ের ব্যবসা ইত্যাদি কাজ করে থাকে।

দুই নং ক্যাম্পের কিছুটা অংশ ছিন্নমুকুল সেখানে প্রায় একশ দশটি পরিবারের বসবাস। সেখানে পুরুষের জন্য টয়লেট চারটা ও বাথরুম দুইটা এবং মহিলাদের জন্য টয়লেট তিনটা তার মধ্যে একটি নোংরা দিয়ে ভরা যার ফলে সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এদিকে, বাথরুম দুইটাও ময়লা ও দুর্গন্ধে ভরা।

ছিন্নমুকুলে বসবাসকারী মুক্তা বেগম বলেন, এই এলাকার বাইরে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি আছে যারা আমাদেরকে এই জায়গা ছেড়ে থেকে যেতে বলে।

রবার্টসন্সগঞ্জ রোডের পাশে অবস্থিত নিউ রিলিফক্যাম্প। এখানে প্রায় একশ ষাটটি পরিবারের বসবাস। সেখানে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য টয়লেট আছে ত্রিশটি ও বাথরুম আটটি। এই ক্যাম্পে নেই কোনো ড্রেনের ব্যবস্থা। গোসলের পানি সবসময় রাস্তায় জমে থাকে। যার কারণে তাদের যাতায়াত করতে সমস্যা হয়।

এই ক্যাম্পের ইনচার্জ তালিশ হোসেন বলেন, সেখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, টয়লেটের দেয়াল ফেটে গেছে। আমরা আশঙ্কা করছি যে কোনো সময় এসব দেয়াল ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আরো বলেন,  সেখানকার সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন তাদের ছেলে মেয়ে বাবা মাকে নিয়ে অতি কষ্টে জীবন যাপন করছেন। বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে পানি দিয়ে সমস্ত বাড়ি ঘর ডুবে যায়। তাই তাদের কাজকর্ম করতে অসুবিধা হয় এবং বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়।

এই ক্যাম্পের জাবেদ হোসেন নামে এক বাসিন্দা বলেন, সরকার আমাদের জন্য কোনো চাকরির ব্যবস্থা করেন নাই, তাই আমাদেরকে বিভিন্ন কাজের সন্ধান করে রুটি-রুজির ব্যাবস্থা করতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, শিশুদের লেখাপড়ার জন্য একটি স্কুল আছে, মেয়র ওই স্কুল পরিদর্শন করে বলেছিলেন স্কুলের উন্নয়ন করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

৩নং ক্যাম্পে সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানকারও বেহাল অবস্থা। এখানকার এরিয়া আনুমানিক দুই একর সতের শতাংশ প্রায়। এখানকার সাধারণ মানুষ করুণ অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। এই ক্যাম্পে সাতশ চৌদ্দটা পরিবারে বসবাস, তাদের জন্য নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, টয়লেট ও বাথরুম খুবই খারাপ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য টয়লেট রয়েছে ত্রিশটি ও বাথরুম আটটি। সেখানে কোনো সংরক্ষিত সুইপারের ব্যবস্থা নেই।           

এই ক্যাম্পের বেশি ভাগ মানুষের পেশা হচ্ছে বাসার সামনে দোকান দিয়ে জারকা পিয়াজি বিক্রি করা, অনেকে মুদি দোকান,খেলনার দোকান  বাদামবুট ইত্যাদি বিভিন্ন রকম কাজ করে থাকেন।

এই ক্যাম্পে বসবাসকারী তামান্না বেগম বলেন, আমরা মানুষের বাসায় কাজ করে সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার খরচ চালাই। কারণ আমার স্বামী বেশি টাকা আয় করে না। এমন অনেক পরিবার আছে যারা অনাহারে দিন কাটায়। ক্যাম্পে প্রতি মাসে  রিলিপের কার্ড দেওয়া হত, এখন  বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে তারা  কোনোরকম সাহায্য সহযোগীতা পায় না।

সার্বিক বিষয়ে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর সাইফুল ইসলাম ফুলু বলেন, এরা কর্মহীন সাধারণ মানুষ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা নাই। তাদের উন্নয়নে আমি যতটুকু পারি ততটুকু করার চেষ্টা করি যেমন-বয়স্কভাতা প্রতিবন্ধীভাতা ব্যবস্থা করে দেই।

সিটি কর্পোরেশন থেকে তাদের মৌলিক চাহিদার বিভিন্ন ব্যবস্থা করেছি ল্যাট্রিন টিউবওয়েল। শিশুদের পড়ালেখার জন্য যে স্কুল আছে সেখানে বাইরের দেশের টাকা পয়সা পরিচালিত করা হয়। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নাই তবে টিউবওয়েল ও সাপ্লাই পানির ব্যবস্থা আছে। রাস্তা ও ড্রেনের জন্য টেণ্ডার ইতিমধ্যে হয়ে গেছে মাসখানিকের মধ্যে কাজ শুরু হবে ইনশাআল্লাহ।

এসব বিষয়ে রংপুর সিটি কর্পোরেশন মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, পাকিস্তানি নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরে যে অবস্থায় আছে তারা সেভাবেই থাকবে। সেখানে বাড়ি আছে সাড়ে তিনশ এবং বসবাস করে দুই হাজার লোক, তাদের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে স্যানেটারি  ও বিশুদ্ধ পানির, ইতিমধ্যে আমরা বিশুদ্ধ পানি প্রবাহের ব্যবস্থা নিয়েছি।

তবে এত ব্যাপক লোকের স্যানেটারি উন্নত ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি তবে কিছুটা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেখানে কিছুদিন আগে বারটি ল্যাট্রিন তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু সেফটি ট্যাঙ্ক ও সোকলের ক্যাপাসিটি বাইরে হওয়ার কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে না, তবে আমরা চেষ্টা করছি।

তিনি আরো বলেন, তাদের আবাসস্থল তা বানানোর জন্য প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতার,তারা আছে পরিত্যক্ত ও সরকারি জায়গায়  তাদের নামে নিজস্ব কোনো জায়গা নেই। শিশুদের পড়ালেখার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের আগ্রহ কম, তাদের মা বাবার কোনো স্বপ্ন নাই যে আমার ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে ইঞ্জিনিয়ার হবে।



আজকের রংপুর


No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image






 

 

 

 

 

 
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাহবুব রহমান
ইমেইল: mahabubt2003@yahoo.com