শুক্রবার, ২০ মে ২০২২   Friday, 20 May 2022.  



 উপসম্পাদকীয়


আমাদের প্রতিদিন

 Mar-26-2022 12:05:20 AM


 

No image


৩ এপ্রিল শনিবার মধ্যরাতে হানাদার বাহিনী রংপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় মানুষ মাহফুজ আলী জররেজসহ ১১ জন বন্দি বাঙালিকে দখিগঞ্জ (রংপুর-মাহিগঞ্জ রোড) শ্মশানে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ একজন প্রাণে বেঁচে যান। তিনি হলেন তাজহাটের দীনেশ ভৌমিক (মন্টু ডাক্তার)। সে রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে ১০জন বাঙালি শহীদ হন। (এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে প্রাণদানকারীদের নাম, শহীদদের নামের তালিকায় সংযুক্ত আছে)। দখিগঞ্জ শ্মশানের হত্যাকাণ্ডের পর এ অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, কোনও অবস্থাতেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নাগালের কাছে অবস্থান করা নিরাপদ নয়। যে যেভাবে পারলো পরিবার পরিজন নিয়ে উত্তর সীমান্ত অভিমুখে রওয়ানা দিলো। কয়েকদিনের মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার সিতাই, মাথাভাঙ্গা, হলদিবাড়ি মেকলিগঞ্জ, ধুবড়ি, মাইনকারচর, কোচবিহার, দেওয়ানগঞ্জ, সাহেবগঞ্জ, দিনহাটা, ভারত সরকারের সহায়তায় শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে। পাশাপাশি এসময় বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও বুড়িমারীতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ শিবির চালু হয় এবং সেখানে ইপিআর ও পুলিশের লোকজন দিয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এ ক্যাম্পগুলোর সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন রংপুর থেকে নির্বাচিত এনসিএ সিদ্দিক হোসেন এবং তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন আবেদ আলী এমনিএ ও করিম উদ্দিন এমসিএ। এ সময় জাওয়ানী ক্যাম্প ও সীতাই ক্যাম্পে আশ্রিত শরণার্থীদের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন শাহ আলম আলবানী।

১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় নির্বাচিত জাতীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়। পাকিস্তানে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি করে এ সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে সকাল ১১টায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের মন্ত্রীসভা শপথ গ্রহণ করে। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে আইন, সংসদ বিষয়ক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এইচ. এম. কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এম মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অসংখ্য স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা ও জনতা, দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। নব-নির্বাচিত উপ-রাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন মাগুড়ার তৎকালীন মহকুমা পুলিশ অফিসার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। বৈদ্যনাথতলার আমবাগানটির নামকরণ করা হয়। মুজিবনগর এবং এ সরকার মুজিব নগর সরকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সরকার গঠিত হবার পর সারাদেশকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে বেসামরিক প্রশাসন চালু হয়। বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের দায়িত্ব কুচবিহার জেলা সদরে অবস্থিত উত্তরাঞ্চল বেসামরিক প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত করা হয়। পাশাপাশি এ অঞ্চলকে দেশের ১১টি সেক্টরের মধ্যে ৬নং সেক্টরের অধীনে বোদা, দেবীগঞ্জ, দিনাজপুর, জগদলহাট, খানসামা, ওমরখানা ও বেরুবাড়ি সমন্বয়ে ঠাকুরগাঁও-১ সাব সেক্টরের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন কোয়াড্রন লিডার সদর উদ্দিন। জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, ডোমার, ডিমলা, সমন্বয়ে গঠিত নীলফামারী-২ সাব সেক্টরের দায়িত্বপাপ্ত হন কার্স্টেন নজরুল হক। পাটগ্রাম, বুড়িমারী ও হাতীবান্ধা এলাকা নিয়ে গঠিত বুড়িমারী-৩ সাব-সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন ক্যাপ্টেন দেলোয়ার হোসেন। ভুরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম ও উলিপুর এলাকা নিয়ে গঠিত ভূরুঙ্গামারী-৪ সাব সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন।

মুক্তিবাহিনী সরকারি পর্যায়ে দু'ভাগে বিভক্ত ছিলো। (এক) নিয়মিত সেনাবাহিনী (দুই) গণবাহিনী। বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর লোকদের নিয়ে নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠন করা হয়েছিলো। সরকারি পর্যায়ে এদের নামকরণ করা হয়েছিলো এমএফ (মুক্তিফৌজ)। এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) বা গণবাহিনী নামে আর একটি বাহিনী গড়ে ওঠে। এতে সর্বস্তরের জনগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলো। গণবাহিনীর সংখ্যা প্রাথমিক ট্রেনিং প্রাপ্ত সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ওইসব গেরিলা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অবস্থানে নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে এবং ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার মধ্যদিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করছে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব ছাড়াই বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) গঠিত হয়। এ বাহিনী মুজিব বাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে। মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণ ছিলো মূলত গেরিলা যুদ্ধের। তবে এ বাহিনীতে যানবাহন ছাড়া বহনযোগ্য ভারী অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছিলো। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুজিব বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করতে হত। মুক্ত এলাকায় অবস্থান নেয়া তাদের জন্য ছিল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ‘মুজিব বাহিনী সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার অবগত থাকলেও সেনাবাহিনীর সেক্টর কমান্ডারগণ এ বিষয়ে কিছুই জানতে না। ফলে ‘মুজিববাহিনী’ যখন কোনও অপানেশনে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর সাথে ‘সেম সাইড’ হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনী মুজিব বাহিনীর সদস্যদের বন্দি করে। কোথাও কোথাও ছোটখাটো সংঘর্ষ ঘটে, তবে একথা বলা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধে সকল বাহিনীর লক্ষ্য ছিলো এক ও অভিন্ন-বাংলার স্বাধীনতা।

সারা জেলায় মুক্তিযোদ্ধা সাধারণ মানুষ কে সংগে গিয়ে যখন গেরিলারা চোরা গোপ্তা আক্রমণ করতে থাকে তখন দিশেহারা পাকিস্তান হানাদার বাহিনী রংপুরের আত্মসমর্পণকারী এম. এন. এ আজিজারকে দিয়ে রংপুর রেডিওতে ১৯ মে বক্তৃতা করায় ‘শেখ মুজিব বেইমান, বিচ্ছিন্নতাবাদী সে পাকিস্তান অখণ্ডতায় বিশ্বাস করে না। পূর্ব পাকিস্তানবাসীর উচিৎ শেখ মুজিবের পথ পরিহার করে পাকিস্তানকে রক্ষা করা। গ্রন্থকার স্বাধীনতার পরবর্তি সময় রংপুর রেডিও থেকে এ বক্তৃতার টেপ উদ্ধার করে বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেয়।

রংপুর অঞ্চল প্রাকৃতিক দিক থেকে সম্মুখ সমরে উপযুক্ত না হবার কারণে সে সময় এ অঞ্চলের অধিক সংখ্যক গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ জেলা তিস্তা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, আখিড়া নদীদ্বারা প্রায় অর্ধ বৃত্তাকারে বেষ্টিত। মুক্তিযোদ্ধারা নদীসমূহের অপর পাড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়ে সুবিধা মতো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উপর গেরিলা এ্যাকশন শুরু করে। জনারণ্যে মিশে যায় গেরিলারা। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে এবং মুক্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে আত্মরক্ষাসহ প্রতিরোধের জন্য তারা প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। এসময় মেরিলারা রংপুর শহরাঞ্চলে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাতে থাকে। রংপুর শহরের অরিয়েন্টাল সিনেমা হল, ল²ী সিনেমা হল, পুলিশ ফাঁড়ি, পৌরবাজার এবং রেডিও স্টেশনের গেটে। এতে করে দখলদার বাহিনীর সহযোগীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এ ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা সন্ধ্যের পর চলাচল বন্ধ করে দেয়। প্রকৃতিও এ সময় বাঙালি জাতির সহযোদ্ধা হয়ে ওঠে। ঘন ঘন বৃষ্টিপাত এবং বর্ষণের ফলে হানাদার বাহিনী কেবলমাত্র শহর ব্যতীত অন্যান্য এলাকায় যাতায়াত বন্ধ করে দেয়।

প্রকৃতপক্ষে জুলাই মাস থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সুসংগঠিত হয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। এ সময় মুজিবনগর সরকার ভারত, রাশিয়া, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশ থেকে অস্ত্রসহ সার্বিক সহযোগীতা লাভ করায় মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায়। বিপুল উদ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা রংপুর অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের সাথে। এ সময় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের পাটগ্রাম, বাউড়া, বড়খাতা, সাহেবগঞ্জ, উলিপুর, চিলমারী, ভুরুঙ্গামারী, লালমনিরহাট, কালিগঞ্জ, হাতিবান্ধা, ডোমার, ডিমলা, নিলফামারী, চিলাহাটিসহ রংপুর অঞ্চলের গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, পীরগাছা, তিস্তা, এলাকায় প্রচণ্ড গেরিলা আক্রমণ শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এ্যাম্বুস পেতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গাড়ি বহরে আক্রমণ চালাতে থাকে। এ সময় হাতিবান্ধায় একটি সামরিক ট্রেনের ওপর আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধা এবং মুজিব বাহিনীর গেরিলারা। এতে পাকিস্তান বাহিনীর প্রায় ১০ জন সৈন্য নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেয়। এ অভিযান যৌথভাবে চালায় কাউনিয়ার মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানি কমান্ডার তাজির উদ্দিন ও তার যোদ্ধারা এবং মুজিব বাহিনীর গেরিলারা। মুজিব বাহিনীর গেরিলারা এবং মুক্তিযোদ্ধা লাভ করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা এবং গেরিলারা চৌদ্দবাড়ির চর, দু’আনির চর, ছয়আনির চরসহ তিস্তার পাড়ের বিভিন্ন চরে সংগঠিত হতে থাকে।

মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলাদের পরপর ক'টি সফল আক্রমণের পর পাকিস্তানী বাহিনীর মরিয়া হয়ে ওঠে। জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ডিমলার কচুকাটায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর ভোর বেলা অতর্কিতভাবে আক্রমণ চালায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। দু’পক্ষে গুলি বিনিময় হয় দীর্ঘক্ষণ ধরে। এতে পাকিস্তান বাহিনীর ৭জন সদস্য নিহত হয়। এ যুদ্ধে শহীদ হন ১ নং কোম্পানি কমান্ডার আনজারুল ইসলাম (বডি নং- ১/১) আহত হন বেশ ক'জন মুক্তিযোদ্ধা। এ সময় পার্শ্ববর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত টোপাপাড়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে দিনের বেলায় পাকিস্তানী সেনারা অতর্কিত আক্রমণ করে। তখন ক্যাম্পে ছিলো জনা-পঁচিশেক মুক্তিযোদ্ধা। তারাও পাল্টা আক্রমণ চালায়। প্রায় এক ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। এতে ১২ জন হানাদার সেনা ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায় এবং আহত হয় অনেকেই। সে-ই যুদ্ধে শহীদ হয় মিঠাপুকুরের সন্তান গোলাম গৌউস নওশা (এ্যাডভোকেট আব্দুল গণির ছোট ভাই)। এ যুদ্ধে সাহসী নেতৃত্ব দেন রংপুরের মাহবুবুউল আলম মহা ও পানোয়ার রহমান ভূঁইয়া পিন্টু।

এ সময় গেরিলারা দখলদার বাহিনীর এলাকায় জনারণ্যে আশ্রয় নিয়েছে। মুজিব বাহিনীর সদস্যদের সাথে প্রায়শ যোগাযোগ রক্ষা করতেন রংপুরের প্রবীণ রাজনৈতিক এবং বিশিষ্ট লেখক সুনীল কুমার গুহ। রংপুর অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি থানায় মুজিব বাহিনীর এক একটি ইউনিট (৯ থেকে ১১ জন) অবস্থান করছিল। সে সময় তারা সুকৌশলে অবরুদ্ধ মানুষকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছিল। রংপুরের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার সৈয়দ শামীম আহসানের সাথে মুজিব বাহিনীর বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ডিস্ট্রিক্ট লীডার মুকুল মোস্তাফিজুর রহমান-এর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। শামীম আহসান সুকৌশলে বৃহত্তর রংপুর জেলার ৩১টি থানার ম্যাপ সরবরাহ করেন এবং পরবর্তী সময়ে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ডিসিপুলের একখানি জীপ এডিসি সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে মাঝে মধ্যেই গেরিলাদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করতেন। গেরিলারা সে-ই জীপে করে অস্ত্রশস্ত্র এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র রংপুর সদরসহ গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী এবং কুড়িগ্রামে প্রেরণ করতো।

৩ সেপ্টেম্বর ডিমলায় (বর্তমানে নীলফামারী জেলার একটি উপজেলা) শটিবাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে হানাদার বাহিনীর ওপর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুন্সির বাহিনীর গেরিলা যৌথভাবে আক্রমণ পরিচালনা করে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মতিয়ার রহমান ও কোম্পানি কমান্ডার হাসে দিন সরকার বীর প্রতীক এবং মুজিব বাহিনীর গেরিলাদের পক্ষে মুকুল মোস্তাফিজুর রহমান এবং তার গেরিলা দল।

গেরিলা বাহিনী পরবর্তী সময়ে গঙ্গাচড়া উপজেলার শব্দবদহের তালা নানার বাহিনীর একটি কনভয়ের উপর আক্রমণ চালায়। এতে ২ জন হানাদার বাহিনী এবং ৫জন রাজাকার নিহত হয়। পরদিন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিপুল প্রস্তুতি গ্রহণ করে তালতলা এলাকার সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালায়। হানাদাররা এক পর্যায়ে তালতলা মসজিদে ঢুকে ১৭ জন মুসল্লীকে মসজিদের ভেতর গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

সেপ্টেম্বর রংপুরের মুক্তাঞ্চল পাটগ্রামে এক জনসভায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ভাষণ দেন। শেষে মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।

২০ সেপ্টেম্বর ছাতনাই বালাপাড়া মুক্তিযোদ্ধার অবস্থানের ওপর হানাদার বাহিনী ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধারা সে সময় সেখানে সংখ্যা কম ছিল। বিপুল সংখ্যক হানাদার বাহিনীর আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময় প্লাটুন কমান্ডার মোহাম্মদ আলী (বডি নং- ৪০/২৩) পালাতে ব্যর্থ হয়ে মৃত্যুর ভান করে পড়ে থাকে। হানাদার বাহিনা তাকে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করে।

মুক্তিযোদ্ধারা নভেম্বর মাসের শেষ দিকে ডিমলায় অবস্থানরত পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর সারাশী আক্রমণ চালায়। যুদ্ধে পরাজিত হানাদার বাহিনী ডিমলা ছেড়ে নীলফামারী শহরে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধারাও নীলফামারী শহরের দিকে এগুতে থাকে। এ সময়ে ভারতীয় মিত্রবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে এসে সশস্ত্র সহায়তা দিতে থাকে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা আরো সাহসী হয়ে ওঠে। দেওয়ানগঞ্জ, চিলাহাটী, ডোমার, ডিমলায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা দলগুলো বিভিন্ন কোম্পানি কমান্ডার-এর নেতৃত্বে নীলফামারী ও সৈয়দপুর ক্যান্টানমেন্ট আক্রমণের লক্ষ্যে বিপুল উদ্যেমের সাথে এগুতে থাকে। এতে কোম্পানি কমান্ডার রওশন আলী, আব্দুল মতিন, আব্দুর রাজ্জাক, গোলাপ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, নূরুল আলম খোকন, অপিল উদ্দিন, ইলিয়াস উদ্দিন এবং জিএল মোজাফ্ফর হোসেন চাঁন্দ, জয়নাল আবেদিন, আশরাফুজ্জামান দুদু প্রমুখ নেতৃত্ব দেন। মুজিব বাহিনীর গেরিলা দলগুলো পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। এদের মধ্যে মিজানুর রহমান চৌধুরী, তবিবুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন বুলবুল, টুপটুল, জয়নাল আবেদীন প্রমুখের ইউনিটগুলোর কর্মকাণ্ড ছিলো উল্লেখযোগ্য।

১০ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানি মুক্তাঞ্চল পাটগ্রাম সফরে আসেন। বেলা ৪টায় এক বিরাট জনসভায় তাঁরা ভাষণ দেন। জনসভা শেষে রংপুর বেতারের সংগীত শিল্পী সিরাজউদ্দিন এর সমন্বয়ে ‘বিপ্লবী বাংলা গীতিনকশা’ নামে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনী প্রধান পাটগ্রামে রাত্রি যাপন করেন। পরদিন ১১ অক্টোবর সকাল ৮টায় মুক্তিবাহিনীর হসপিটাল পরিদর্শন করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রæত উন্নতির জন্য তিনি টেলিফোন এক্সচেঞ্জ পরিদর্শন করেন। এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দিবারাত্র সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

৮ নভেম্বর মুজিব বাহিনীর ১টি ইউনিট নিয়ে খোন্দকার মুখতার ইলাহী খুনিয়াগাছ চড় থেকে লালমনিরহাটের (বর্তমানে জেলা) অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। লালমনিরহাটের বড়বাড়ির আইড় খামার আমে রাত্রিযাপনের জন্য যাত্রা বিরতি করে। দালালদের চক্রান্তের জন্য ৯ নভেম্বর ভোরবেরা পাকিস্তান হানাদার বাহিনী গ্রামটি ঘিরে ফেলে এবং মুখতার ইলাহীসহ ৫৪জন গ্রামবাসীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে (শহীদদের বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি)। এ সময় মুজিব বাহিনীর একটি গেরিলা দল রাজারহাট উপজেলায় সিন্দুরমতি দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশকালীন হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গেরিলারা পরবর্তী সময়ে একত্রিত হয়ে খুনিয়াগাছ এলাকায় আশ্রয় নেয় এবং পরবর্তী সময়ে হারাগাছ এলাকায় সাদা মসজিদের কাছে হানাদার বাহিনীর একটি মিলিশিয়া ক্যাম্প আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে হারাগাছ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত মিলিশিয়াদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ আক্রমনে নেতৃত্ব দেন আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টু, হাফিজুল হক সরকার নিলু, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, আব্দুল কুদ্জ্জুস (প্রয়াত), লুৎফর, হারুন, রফিক, শাহজাহান প্রমুখ। মুজিব বাহিনীর খুনিয়াগাছের যে এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল হানাদার বাহিনী পরবর্তী সময়ে তা জ্বালিয়ে দেয়।

৪ ডিসেম্বর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ কমান্ড গঠিত হয় এবং তা মিত্রবাহিনী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ৪ ও ৫ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কুড়িগ্রামে অবস্থিত পাকিস্তানী হানাদারদের। ওপর স্থল ও বিমান হামলা চালাতে থাকে। এ হামলায় হানাদার বাহিনী টিকতে না পেরে লালমনিরহাট এবং রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে ফিরে আসে। ৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ৮ ডিসেম্বর ৬নং সেক্টর কমান্ডার এম, কে, বাশার কুড়িগ্রামের কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন এবং বেসামরিক প্রশাসন চালু করেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে লালমনিরহাট আক্রমণ করে হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। একই সময়ে নীলফামারী শহরকেও মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করে হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্তকরে। হানাদার বাহিনী আশ্রয় নেয় সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সারাশী আক্রমণের মুখে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে একমাত্র রংপুর এবং সৈয়দপুর সেনানিবাস ছাড়া সম্পূর্ণ সেক্টরটি মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এ সময় জনগণের মাঝে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাহায্যকারী এবং দোসররা মুষড়ে পড়ে।

১৩ ডিসেম্বর মুজিব বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় গঙ্গাচড়া থানায় ২১২ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। রাজাকারদের কাছ থেকে ৩টি এএমজিসহ ২০৯টি রাইফেল উদ্ধার করা হয়। এ আত্মসমর্পণে সাহসী ভূমিকা পালন করে গঙ্গাচড়ার আফজাল নামে একজন যুবক। আফজালকে মুজিব বাহিনীর গেরিলারা পূর্বেই মটিভেটেড করে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করেছিলো। কোম্পানি কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক সে সময় মুজিব বাহিনীর গেরিলাদের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন।

১৫ ডিসেম্বর সৈয়দপুর এবং তিস্তায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়। ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী তিস্তা ব্রিজের একটি গার্ডার উড়িয়ে দিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালিয়ে আসে। রংপুর এবং সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্র বাহিনীর কাছে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন পাকিস্তান হাই কমান্ড থেকে নির্দেশ দেয়া হয় ‘তোমরা সবাই ডিফেনসিভ পজিশন ছেড়ে এক জায়গায় একত্রিত হয়ে যাও। সারেন্ডার হতে যাচ্ছে। শুধু যেখানে একত্রিত হবে সেখানে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নাও।’ তারা ভাবছিল ভারতীয় বাহিনী তেমন কিছু করবে না। কিন্তু মুক্তিবাহিনী পেলে একেবারে নাস্তানাবুদ কিংবা খতম করে দেবে। তাই ম্যাসেজে বলা হচ্ছিল ‘মুক্তিকো খেলাফ পজিশন লে লো। সব একাটঠ্যা হো যাও। সারেন্ডার হোনে বালা হ্যায়।

১৬ ডিসেম্বর রংপুর শহর এবং শহরতলীতে লড়াই চলতেই থাকে। মুক্তিবাহিনী দমদমা ব্রিজের ব্যাংকারে অবস্থানরত পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালা। মুক্তিযোদ্ধা আতিয়ার রহমান অসীম সাহসের সঙ্গে তার দল নিয়ে এ আক্রমণ পরিচালনা করেন। এতে বহু সংখ্যক হানাদার বাহিনী নিহত হয় এবং অনেকে প্রাণ ভয়ে ট্যাংক ব্রিজের কাছেও ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়। অপরদিকে জাফরগঞ্জ বাধাপ্রাপ্ত হয় মুক্তিযোদ্ধারা। সংঘর্ষের পুর্যুদস্ত হলে পিছু হটে হানাদার বাহিনী। ১৭ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে হানাদার বাহিনী। সম্পূর্ণ শত্রæমুক্ত হয় রংপুর

নয় মাসের অবরুদ্ধ মানুষ মুক্তির আনন্দে উদ্বেলিত। আনন্দ-বেদনায় হাজারো জনতা মুক্তির মিছিলে একাকার হয়ে যায়। বিজয়ের আনন্দ, স্বজন হারানো ব্যথা সব মিলিয়ে সেদিন জনমানুষের অনুভূতিতে সৃষ্টি হয় অপূর্ব শিহরণ। অনেকে প্রিয়জনের খোঁজে পথ চেয়ে থাকে। মুক্ত আকাশে তখন উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দখলদার বাহিনী রংপুর অঞ্চলে যে হত্যাযজ্ঞ চালায় তার কিছু সংক্ষিপ্ত বিবরণ ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এমনকিছু নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সে সময় রংপুরের মাটিতে দখলদার বাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে তা ভোলা যায় না এবং ভোলাও নয়।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধে রংপুর, মুকুল মোস্তাফিজ।



আজকের রংপুর


No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image






 

 

 

 

 

 
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাহবুব রহমান
ইমেইল: mahabubt2003@yahoo.com