শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বার ২০২২   Friday, 30 September 2022.  



 উপসম্পাদকীয়


আমাদের প্রতিদিন

 Mar-26-2022 11:33:25 AM


 

No image


মোঃ আকতারুল ইসলাম:

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের সবার চোখ ছিলো প্রিয় মাতৃভূমির মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ। হয়তো আমরা এখনো নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ, কিন্তু অচিরেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাব। এর যথেষ্ট কারণও আছে। যেভাবে আমরা কৃষির আধুনিকায়ন, শিল্পের ব্যপ্তি বৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, বিভিন্ন মধ্যম সারির ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান  তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, হাইটেক পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে আইটি পণ্য রপ্তানিসহ যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, তাতে সরকারের ঘোষিত ২০২৬ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা, তাতে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর অসম্ভব হবে না। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক আয়ের ক্ষেত্রের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক আয়ের ক্ষেত্র, যেমন ফ্রিলান্সিংয়েও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখন যথেষ্ট মর্যাদার, বিশ্বে ৮ম (সূত্রঃ রাইজিংবিডি, ১১ নভেম্বর, ২০২১)। বর্তমান সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের কাতারে আসবে ২০৪১ সালের মধ্যেই। আর এই অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো শিক্ষাখাত। বাংলাদেশে যে কয়টি শিক্ষাস্তর আছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো উচ্চ শিক্ষা। কারণ সকল প্রকার জ্ঞান এই স্তরেই সৃষ্টি হয়। এজন্য মেধাবি তরুণদের উচ্চশিক্ষার পথ মসৃণ করতে প্রয়োজন সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে সরকারি ঋণ।

সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের কাতারে আসবে ২০৪১ সালের মধ্যেই। আর এই অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো শিক্ষাখাত। এজন্য মেধাবি তরুণদের উচ্চশিক্ষার পথ মসৃণ করতে প্রয়োজন সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে সরকারি ঋণ।

যে জাতি যতো বেশি নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পেরেছে; সাহিত্য, বিজ্ঞান, স্থাপত্যে এগিয়ে গেছে; তাদের উন্নয়নই হয়েছে টেকসই। অর্থনীতি হয়েছে মজবুত, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে সগৌরবে। বিশ্বায়নের এই যুগে জ্ঞান অর্জন যে শুধু নিজ দেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বিষয়টি এমন নয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নানাবিধ সীমাবদ্ধতায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান সৃষ্টি করা অনেক সময়ই অসম্ভব। এজন্য প্রয়োজন প্রাশ্চাত্যের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ, আহরিত জ্ঞান ব্যবহারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, ধীরে ধীরে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জ্ঞান শিল্পের সাথে যারা জড়িত তাদের যথাযথ মর্যাদায় আসীন করা।

২০২১-২২ অর্থ বছরে বাংলাদেশ শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়েছে মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ, জিডিপির হিসেবে যা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। ইউনিসেফের মতে আদর্শ মানদণ্ড হলো মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ। ...এমনকি ভূটানও তার জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয় করে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে।

আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্নাতক থেকে পোস্টডক পর্যন্ত কেমন জ্ঞান সৃষ্টি হয় আর রাষ্ট্রের নজর কেমন তা সহজেই বুঝতে পারি বিশ্বে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থান দেখে। পৃথিবীতে খুব কম রাষ্ট্রই আছে যাদের অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ভীতের উপর দাড়িয়ে আছে, অথচ শিক্ষায় বরাদ্দ কম। ২০২১-২২ অর্থ বছরে বাংলাদেশ শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়েছে মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ, জিডিপির হিসেবে যা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ।  ইউনিসেফের মতে আদর্শ মানদণ্ড হলো মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ। বাংলাদেশ পাকিস্তানের থেকেও শিক্ষায় কম ব্যয় করে। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাও তাদের মোট জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশের বেশি ব্যয় করে শিক্ষায়, এমনকি ভূটানও তার জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয় করে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর একটি বড় অংশ বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় যায় সেই দেশ বা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ অর্থায়নে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী আছে যারা প্রয়োজনীয় অর্থ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংকে জমা রেখে প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ালেখার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজের মাধ্যমে নিজের ও শিক্ষার ব্যয় বহন করেন। খুব কম শিক্ষার্থী আছে যারা সম্পূর্ণ নিজ খরচে বিদেশে শিক্ষাগ্রহণ করেন।

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মেধাবী তরুণ যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে তাদের জন্য বড় বিপত্তি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আবেদন ফি। যেমন জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন ফি ৭৫ ইউরো থেকে কমবেশি ৯০ ইউরো পর্যন্ত, যা বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত। পাশাপাশি প্রয়োজন ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা প্রমাণ করা, যেমন আইইএলটিএস, টোফেল ইত্যাদি। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর জন্য প্রয়োজন হয় জিআরই, জিম্যাট; অনেক দেশ স্যাট গ্রহণ করে। এসব পরীক্ষার ফি আনুমানিক ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকার মতো। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান সেই দেশে শিক্ষার্থীর সব ব্যয় বহন করলেও ভ্রমন ব্যয় শিক্ষার্থী বহন করবে এমন শর্ত দেয়। এই হিসেবে আনুষঙ্গিক ব্যয় হয় কমপক্ষে ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যোগান দিতে পারে না বলে বহু স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যায় অকালে, রাষ্ট্র হাড়িয়ে ফেলে জ্ঞান সৃষ্টির এই অমোঘ সুযোগ। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের সহজ উপায় হলো শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি ঋণের ব্যবস্থা করা।

শুধুমাত্র বিদেশে শিক্ষা গ্রহণেই নয়, দেশেও এর প্রয়োজনীয়তা এখন সার্বজনীন। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক ব্যয় কম। সীমিত সম্পদের দেশে সব শিক্ষার্থীর জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন নিশ্চিত করা একেবারেই অসম্ভব। এতে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বেছে নেয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেও বেশি। এখানে শিক্ষার ব্যয়ও অনেক বেশি। স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করতে প্রতিষ্ঠানভেদে ১০-৪০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা একেবারেই অসম্ভব।

এই সমস্যা সমাধানে একমাত্র হাতিয়ার রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা। প্রথমত, বিদেশে যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক ও দেশে যারা নিজ শিক্ষার ব্যয়ভার বহনে অক্ষম তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সরকারি বরাদ্দ রাখা যাতে প্রয়োজনের সময় যেকোন শিক্ষার্থী যৌক্তিকতা  ও প্রমাণ সাপেক্ষে বিনাবাধায় খুব সহজে শিক্ষা ঋণ গ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, দেশের সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সরকার সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিনা জামানতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারে। তৃতীয়ত, বিশিষ্ট গুণীজনদের নামে বৃত্তি ও ফেলোশিপের ব্যবস্থা করতে পারে। চতুর্থত ও সর্বশেষ, রাষ্ট্র এমন একটি সৃজনশীল কাঠামো গ্রহণ করতে পারে যাতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাশ শিক্ষার্থী একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য নির্বাচিত হবেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দিবে রাষ্ট্র।

একটি আধুনিক, সৃজনশীল ও বিজ্ঞানমনষ্ক জাতি গঠনে যুগোপযোগী জ্ঞান সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। নতুন নতুন জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার যেমন পরিবর্তন হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন হবে তরান্বিত ও টেকসই, যা পরোক্ষভাবে গণতন্ত্রের উন্নয়ন ঘটাবে। বাঙ্গালির এই অগ্রযাত্রায় শিক্ষা ঋণ হতে পারে স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ উপহার। উন্নত বিশ্বের স্বপ্নে বিভোর আত্মপ্রত্যয়ী বাঙালির কাছে এর কোন বিকল্প নেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।



আজকের রংপুর


No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image






 

 

 

 

 

 
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাহবুব রহমান
ইমেইল: mahabubt2003@yahoo.com