শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বার ২০২২   Friday, 30 September 2022.  



 বাংলাদেশ


আমাদের প্রতিদিন

 Jul-06-2022 08:17:35 PM


 

No image


মোঃ রুপাল মিয়া:

মানুষের জীবন-মৃত্যুর মাঝে বিবাহ প্রকৃতির একটি অলঙ্ঘনীয় বিধান। সামাজিক ও ধর্মীয় বৈধ চুক্তির মাধ্যমে দু’জন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে এই বিবাহ বন্ধন তৈরি হয়। জৈবিক চাহিদা পূরণ ও ভবিষ্যতের বংশ বিস্তার বিবাহের অন্যতম উদ্দেশ্য। এজন্য মানব জীবনে বিবাহ অতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু অতি অল্প বয়সে বিবাহ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এছাড়া অল্প বয়সে বিবাহ দেওয়া শিশু নির্যাতন বা যৌন নির্যাতনের মধ্যেও পড়ে যা আমাদের দেশের অনেকে তা বিশ্বাস করেন না।

আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক মনে করেন, এদেশের মেয়েরা সামাজিকভাবে সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ নয়। এজন্য তারা অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে থাকেন। বয়স বেশি হলে মেয়েদের সৌন্দর্য্যহানি ঘটবে ভেবে অনেকে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে আগ্রহী হন। ভালো কোন সম্বন্ধ আসলে তা হাতছাড়া না করার প্রবণতাও বাল্যবিবাহের অন্য একটি কারণ। আবার অনেকে মনে করেন, বেশি বয়স হলে বেশি যৌতুক দিতে হবে (যদিও যৌতুক আইনত দণ্ডনীয়) এমনটা ভেবেও অল্প বয়সে বিবাহ দেওয়া হয়। ছেলে-মেয়েদের ভরণ-পোষণ ও লেখা-পড়ার খরচ চালাতে না পারা অর্থাৎ দারিদ্র্যতাও বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী। এছাড়াও অল্প বয়স্ক অনেক ছেলে-মেয়ে বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

বাল্যবিবাহ নারীর অগ্রগতিকে ব্যাহত করে। এর ফলে নারীর অগ্রযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হয়। অল্প বয়সে বিবাহ মাতৃ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। এমনকি নবজাতকের মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি করে। অনেক সময় নবজাতক মারাও যায়। নবজাতক বেচেঁ থাকলেও পরবর্তীতে শারিরীক ও মানসিক জটিলতায় ভোগে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক মায়ের প্রতিবন্ধী শিশু জন্মদানের সম্ভাবনা বেশি থাকে। অল্প বয়সে বিবাহের ফলে একটি মেয়ের পক্ষে অন্য একটি পরিবারের অনেক বিষয় সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক শারিরীক ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়। এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনাও ঘটে। পরবর্তীতে ঐ মেয়ের বাবা-মায়ের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়, যা কোন বাবা-মা কখনো কামনা করেন না। মেয়ের ভবিষ্যতটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

বাল্যবিবাহ কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না। তাই সর্বদা নেতিবাচক ফলবাহী বাল্যবিবাহ বন্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবুও আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ থেমে নেই। এটা বন্ধ করতে না পারলে সামাজিক দৃষ্ঠিভঙ্গী নষ্ট হবে ও দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে।

১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ বন্ধে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’ প্রণীত হয়। এই আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর এবং ছেলেদের ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়। ১৯৮৪ সালে এই আইনে পরিবর্তন এনে  মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয় ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। সর্বশেষ বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ‘ বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭’ পাস হয়। এই আইনেও মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের কমপক্ষে ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়।

প্রাপ্তবয়স্ক কেউ বাল্যবিাবহ করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এজন্য দুই বছরের কারাদণ্ড বা একলাখ টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধানও রাখা হয়। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাল্যবিয়ে করলে একমাসের আটকাদেশ ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তির যোগ্য হবে। বাল্যবিয়ের সাথে পিতা-মাতা বা অন্যরা জড়িত থাকলে ছয়মাস থেকে দুই বছর কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। জরিমানার টাকা না দিলে আরও তিন মাসের জেল খাটতে হবে। বাল্যবিয়ে নিবন্ধ করলে নিবন্ধকের লাইসেন্স বাতিল হবে। যিনি বিয়ে পড়াবেন কিংবা নিবন্ধন করবেন তারাও ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও বর্তমান সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ১০৯ নম্বরে বা এসএমস করে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করেছে। এরফলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা দপ্তর বাল্যবিাবহ প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সরকার মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণকে অনুপ্রাণিত করতে শিক্ষা উপবৃত্তি চালু করেছে। এরফলে মেয়েদের ঝড়ে পড়ার হার হ্রাস পাচ্ছে এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে লন্ডনে গার্লস সামিটে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার শূন্যে নামিয়ে আনা ও ১৫-২১ বছরের মধ্যে সংঘটিত বাল্যবিবাহের হার এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। ২০০৭ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৮ বছরের নিচে) ছিল ৭৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৮ বছরের নিচে) ৪৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০০৭ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৫ বছরের নিচে) ছিল ৩২ শতাংশ। ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহের হার (১৫ বছরের নিচে) ১০.০৭ শতাংশে নেমে আসে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় বাল্যবিবাহ হ্রাসের যে হার, আশা করা যায় ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ বাল্যবিবাহমুক্ত দেশে পরিণত হবে।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও নানা ধরনের কর্মসূচী পালন করে থাকে। তবে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার হ্রাস পেলেও এটা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পিতা-মাতার ভূমিকাও মূখ্য।  তাদের মনে রাখতে হবে যে, অল্প বয়সে বিয়ে দিলে শুধু সুন্দর ভবিষ্যতটাই নষ্ঠ হয় না, তাদের জীবনও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।

তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও যেসব বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে-

১। জন্মের পরপরই জন্ম নিবন্ধন করতে হবে। কারণ অনেকেই দেরিতে জন্ম নিবন্ধন করে বয়স বাড়িয়ে মেয়েদের বিয়ে দেয়।

২। বিবাহ রেজিস্টারকারীরা যেন অল্প বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিবাহ না পড়ান সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

৩। মেয়েরাও ছেলেদের মত সমান ভূমিকা রাখতে পারে। তাই অল্প বয়সে বিয়ে না দিয়ে তাদের মধ্যে এমন মনোভাব তৈরি করতে হবে।

৪। প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের দৃষ্ঠান্ত ছেলে-মেয়েদের কাছে বেশি কওে তুলে ধরতে হবে। এতে তাদের মধ্যে সাহসের সঞ্চার হবে এবং নিজেরাও প্রতিষ্ঠিত হতে অনুপ্রাণিত হবে।

৫। বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতামূলক প্রচার অত্যন্ত জরুরী। তাই সরকারিভাবে ও বেসরকারিভাবে বাল্যবিবাহের নেতিবাচক প্রভাব বেশি করে প্রচার করতে হবে।

লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রংপুর।



আজকের রংপুর


No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image






 

 

 

 

 

 
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাহবুব রহমান
ইমেইল: mahabubt2003@yahoo.com