শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বার ২০২২   Friday, 30 September 2022.  



 উপসম্পাদকীয়


আমাদের প্রতিদিন

 Aug-15-2022 12:12:19 AM


 

No image


ফয়সাল আজম ফাইন:

একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ও তার মানসিক বিকাশের জন্য তার পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তেমনি একজন মানুষের জন্য তার মাতৃভূমি অপরিহার্য অংশ হিসেবে মেধা ও মননের বিকাশ ঘটায়। একই সঙ্গে মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য একটি মাতৃভূমির জন্য অপরিহার্য হল তার মানচিত্র ও পতাকা। কোন দেশের মানচিত্র, পতাকা খচিত স্বাধীনতা একদিনে তুঁলির আঁচড় দিয়ে আঁকা কোন একটি চিত্রকর্ম নয়। এই আশ্চর্য চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর পিছনে থাকে অনেক জানা অজানা ইতিহাস। একটি জাতির উত্থান ও পতনের ইতিহাস।

‘জগলুল-নাহার মিশর ইতিহাসের একটি অধ্যায়। নাসের গোটা ইতিহাস। নওরোজী, গোখেল, মালব্য, মোহাম্মদ আলী ভারতের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। গান্ধী সমগ্র ইতিহাস। ফজজুল হক, সোহরাওয়ার্দী বাংলাদেশের ইতিহাসে খণ্ড-খণ্ড অধ্যায়। মুজিব সমগ্র ইতিহাস।’

সার্বভৌমত্ব ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। তাই মাতৃভূমি বা দেশের জন্য অপরিহার্য হল ‘স্বাধীনতা’। অমূল্য সম্পদ এই স্বাধীনতা, যা অর্জন অত্যন্ত কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। পরাধীনতা কী? যে কখনো পরাধীন ছিল না তাকে বোঝানো যাবে না। আবার স্বাধীনতার আসল আনন্দ বা স্বাদ যে স্বাধীন সে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। কোন কোন দেশের স্বাধীনতা, মানচিত্র, পতাকা অর্জন করতে লেগে যায় মাসের পর মাস, আবার কখনো বছরের পর বছর। সঙ্গে স্বীকার করতে হয় হাজারো ত্যাগ, বিসর্জন দিতে হয় লক্ষ লক্ষ প্রাণ। যুগে যুগে পিছিয়ে পড়া একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জন ও উত্থানের পিছনে দেশ, কাল ও পাত্র ভেদে একজন অগ্রসৈনিক থাকেন, যাকে বলা হয় জাতির পিতা।

পৃথিবীর মানচিত্রে তেমনি একটি স্বাধীন সার্বভৌম গৌরবজ্জল রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’। যার সমৃদ্ধ এক ইতিহাস রয়েছে, যে ইতিহাস বিনির্মাণে রয়েছে অফুরন্ত ত্যাগ-তিতীক্ষা। যে স্বাধীনতার জন্য অপেক্ষা ছিল প্রায় ২০০ বছর। একজন মানুষের সারাজীবনের অর্জন এই দেশ। যিনি সারাজীবন বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য অপরিসীম কষ্ট সহ্য করেন, নিজের জীবন বিলিয়ে দেন। বাঙালি জাতির সেই আরাধ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র ও পতাকার ইতিহাসে নিমেষে যে ব্যক্তির নাম চলে আসে তিনি হলেন জাতির জনক ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। বাংলাদেশের ইতিহাস মানে টুঙ্গিপাড়ার সেই ছোট্ট পাড়াগায়ের শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হয়ে ওঠার ইতিহাস।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য জীবন অতিবাহিত করার ফলে জীবনব্যাপী লড়াইয়ের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে মুজিব এক নতুন বাঙ্গালী ‘জাতি’র সংগ্রামী নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি ছিল তার অস্তিত্বে। এ জন্যই তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা লেখক নিরঞ্জন মজুমদার ১৯৭১ সালে তার ‘বঙ্গবন্ধু ও রক্তাক্ত বাংলা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধু ও তার ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক জীবন সম্বন্ধে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর অবদান তুলে ধরে যে অসাধারণ অভিব্যক্তির অবতারণা করেন তা যথার্থ। তিনি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ তৈরিতে তার অবদান স্মরণ করে বলেন, ‘জগলুল-নাহার মিশর ইতিহাসের একটি অধ্যায়। নাসের গোটা ইতিহাস। নওরোজী, গোখেল, মালব্য, মোহাম্মদ আলী ভারতের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। গান্ধী সমগ্র ইতিহাস। ফজজুল হক, সোহরাওয়ার্দী বাংলাদেশের ইতিহাসে খণ্ড-খণ্ড অধ্যায়। মুজিব সমগ্র ইতিহাস।’ তিনিই বাংলাদেশের ইতিহাস, এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

‘স্বাধীনতা’ বাংলাদেশের জন্য যত বেশি গৌরবান্বীত অধ্যায়, আজকের দিনটি ‘১৫ আগস্ট’ বাঙালিদের জন্য ঠিক ততটাই কলঙ্কিত। এই দিনে ঘাতকেরা স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, বাংলাদেশের সেই সমগ্র ইতিহাস, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস কলঙ্কিত করে। হত্যা করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে। যাকে ঘিরে সকল আশা আকাক্সক্ষা আবর্তিত হয়, যার মুখ বাংলার প্রতিচ্ছবি, সেই আলোকবর্তীকাকে কতিপয় দুস্কৃতিকারী হত্যা করে বাঙালি জাতিসত্তায় আঘাত হানে। হত্যা করে বাংলাদেশকে, হত্যা করে বাঙালি জাতির ভবিষ্যতকে।

স্বাধীনতার পর পরই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা বিরোধীদের এমনকি যারা মুক্তিযুদ্ধের চলাকালে বিভিন্নভাবে পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর না হয়ে তাদের সংশোধন করার সুযোগ দিয়ে ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুর এই জয় কোনদিন মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারেনি। তারা আগে থেকেই ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে থাকে। দেশীয়, আন্তর্জাতিক কুচক্রীমহল তাদের ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়। যুগে যুগে বাঙালি জাতির পিছিয়ে পরার পিছনে এদেশীয় ভিনদেশী দোষররাই ছিল দায়ী।

মীরজাফর, খন্দকার মোশতাক এর মত বিশ্বাসঘাতক বার বার কলঙ্কিত করে বাংলাকে। একটা কথা বাঙালি জাতির জন্য আজ অনেকটাই ধ্রুব সত্য বলে ধরা দিয়েছে, আর তা হলো শিল্প কৌশলের প্রতি উৎসাহের পরিবর্তে শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক বাঙালীদের স্বভাবতই। বাঙালি জাতি নিজেদের অনেক আগেই তুচ্ছ, নীচ প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই সারা দেশে হটাৎ করেই দুর্নীতি ও মানুষের অপকর্ম বেড়ে যায়।

স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন আহমেদ বিভিন্ন অপকর্ম, দুর্নীতি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, আমার জীবনের এখন বর্ধিত সময় চলছে। ২৫শে মার্চে অন্যান্যদের সাথে আমারও মৃত্যু হতে পারত। আমি এখন আর মৃত্যুর ভয় পাই না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে কারণে আমরা যুদ্ধ করেছি তা আমরা পাচ্ছি না। বঙ্গবন্ধুর মন শিশুর মত। তিনি একটু কঠোর হলে ভালো হতো।’ কতিপয় লোকের দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে ওঠার কারণে তিনি আক্ষেপ করে এ কথা বলেন।

নিজের জাতির পিতাকে হত্যা করে বাঙালি প্রমাণ করে শিল্প কৌশলের পরিবর্তে শিল্পকলা তাদের স্বভাবতই। যে অবিসংবাদিত নেতৃত্ব, অসাধারণ প্রতিভাবান মানব ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কল্পনা করা যায় না, যে ব্যক্তির সারাজীবন ত্যাগের ফলাফল এই বাংলাদেশ। যে অবিসংবাদিত নেতা পাকিস্তানে আটক থাকার সময় জেলখানার পাশেই তার কবর খোরা হয়েছিল। সেই কঠিন অবস্থায় তিনি বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।’ সেই মহান নেতাকে বাঙালি জাতি হত্যা করতে কুন্ঠাবোধ করেনি।

স্বাধীনতা পরবর্তীতে দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে আত্মনিয়োগ করেন। অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সারাবিশ্বে তাঁর প্রভাব দ্রæত সম্প্রসারণ হতে থাকেন। যা অপশক্তি ভালো চোখে দেখেনি কখনও। ক্ষুধা, দারিদ্র্যতা ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জনগণের কর্মদক্ষতা ও যোগ্য নেতৃত্ববলে দেশ ঘুরে দাঁড়াতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা তাকে সকল জায়গায় প্রশংসিত করে।

বঙ্গবন্ধু বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে অবস্থানকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী এক অভিনন্দন বাণী পাঠান। তিনি বলেন, ‘আপনি বন্দি ছিলেন, কিন্তু আপনার চিন্তাশক্তি ও চেতনাকে কারারুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আপনি নিপীড়িত জনগণের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।’

যুদ্ধকালে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্নভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে। তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্যে বঙ্গবন্ধু সরকার পাক-মার্কিন চক্রের রোষানলে পরে। স্বাধীনতার পরবর্তীতে নানান ভাবে কিসিঞ্জার সরকার বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার ষড়যন্ত্র ও কুটনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকে। পাক-মার্কিন চক্র স্বাধীনতার পূর্বে থেকেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

মোশতাক ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী বিশ্বাসঘাতক। ক্ষমতার লোভে সে অন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর ছিল এই বিশ্বাসঘাতক। যার ফলে বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় তাকে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মোশতাক পাক-মার্কিন চক্রের সঙ্গে জড়িত হয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। যুদ্ধের সময় সে পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে নিউইয়র্কে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে বিরোধ ঘটিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার পরিবর্তে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের কথা বলার পরিকল্পনা করে। তা পরবর্তীতে ফাঁস হয়ে যায়।

১৯৭৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটেনে তৎকালীন মেজর রশীদ বলেন, ১৫ আগস্ট এর আগে তিনবার ১১,১৩ ও ১৪ আগস্ট মোশতাকের সাথে দেখা হয়। মোস্তাক রশিদকে বলেন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দেশ অগ্রগতির কোন সম্ভাবনা নেই। হত্যা পরিকল্পনা সরাসরি উল্লেখ না করে রসিদ বলেন, শেখ মুজিবকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে এবং এর ফলে তার মৃত্যু হতে পারে। মোস্তাক বলেন, ‘কারো যদি সাহস ও দৃঢ়সংকল্প থাকে তবে তার এগিয়ে যাওয়া উচিত।’

আর মেজর জিয়া ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রধান বেনিফিশিয়ারি। মূলত সামরিক মহলে ধারণা করা হয় মেজর জিয়ার প্রবীণত্ব উপেক্ষা করে জেনারেল শফিউল্লাহকে চীফ অব আর্মি স্টাফ পদে নিয়োগ দেয়া হয় বলে মেজর জিয়া অনেক পরিমাণে বিচলিত বোধ করে। ক্ষমতার লোভ এবং ক্ষুব্ধ হয়ে সে হত্যাকাণ্ডে সম্মতি জ্ঞাপন করে। মোশতাক চক্র সামরিক বাহিনীর সাথে নানা ভাবে যোগাযোগ করতে থাকে। মেজর ফারুক ও রশিদের সাথে যোগাযোগ করে। ১৯৭৫ সালের ২০ শে মার্চ সন্ধ্যাবেলা মেজর জিয়ার সঙ্গে ফারুক দেখা করে এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কথা বলে মেজর জিয়াকে সে বলে, আমরা আর জুনিয়র অফিসাররা সব ঠিক করে ফেলেছি, আমার আপনার সমর্থন ও নেতৃত্ব চাই। উত্তরে মেজর জিয়া বলে, ‘তোমরা জুনিয়র অফিসাররা যদি এটা করতে চাও তবে এগিয়ে যাও।’

এভাবে ষড়যন্ত্র করে মোশতাক-জিয়া চক্র সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সৈন্যদের মাধ্যমে ১৫ আগস্ট ভোর বেলা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নাম্বার বাড়িতে আক্রমণ করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেদিনের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ শহীদ হন শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ভাই - বীরমুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, বীরমুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ও দশ বছরের শেখ রাসেল। কামাল ও জামালের নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, চাচা মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জামিল এবং পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এএসআই সিদ্দিকুর রহমান। ১০ বছরের ছোট রাসেলকেও তারা ছাড় দেয়নি। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যকে। ভাগ্যক্রমে দেশের বাইরে অবস্থান করার কারণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে দেশের বর্তমান সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা। মহান আল্লাহ তাআলার অশেষ কৃপায় বেঁচে যান দুই বোন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার সময় জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োজিত ছিলেন। শাফায়াত জামিল ছিলেন ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার। ১৫ আগস্ট ভোর ৫.৩০ মিনিটে সামরিক বাহিনী রেডিও স্টেশন ও বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আক্রমণ করে। বঙ্গবন্ধু শফিউল্লাহর সাথে টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘শফিউল্লাহ, আমার বাড়ি আক্রমণ করেছে। কামালকে মনে হয় মেরেই ফেলেছে। তুমি ফোর্স পাঠাও।’ শফিউল্লাহ এসময় উত্তরে বলেন, স্যার... i am doing something’।

শফিউল্লাহ আর্মি হেডকোয়ার্টাসে গিয়ে শাফায়াত জামিলের বাহিনীর কি হয়েছে তা বের করার চেষ্টা করেন। এর কিছুক্ষণ পর খালেদ মোশাররফ এসে জেনারেল শফিউল্লাহকে বলেন,  ‘Bangabandhu is dead. Full army has revolted and entire army has celebrated’

জেনারেল শফিউল্লাহ উত্তরে বলেন, ‘i don't take it.’। এসময় মেজর ডালিম বন্দুক তাক করে তার দিকে এসে বলে, ‘president wants to talk to you. শফিউল্লাহ বলেন, ‘Dalim i am used to seeing this weapon. If you come to use it, use it. But don't point it at me. Leave it outside, or use it.’ এ সময় মেজর জিয়া সামনে ছিল। ডালিম বন্দুক নিচে নামিয়ে তাদের নতুন প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলার জন্য আবার বললে মেজর শফিউল্লাহ বলেন, ‘He may be your president but not my president.’

হত্যাকাণ্ডের পর ১৫ আগস্ট সকালে হত্যাকারীরা খন্দকার মোশতাককে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। খন্দকার মোশতাক সেদিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম তার ভাষণ দেন। এসময় ক্ষমতা দখলকারীরা বলেন, মেজর রশীদ, মেজর ফারুক ও মেজর ডালিমের নেতৃত্বে ৬জন জুনিয়র অফিসার আর কারো সঙ্গে পরামর্শ না করে তাদের নেতৃত্বাধীন ৩০০ জওয়ানদের সহযোগীতায় বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এই সংবাদ বিদেশী সাংবাদিকগণ তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেন। শেখ মুজিবের আমলে তথাকথিত দুর্নীতির ফলে জনসাধারণের মধ্যে হতাশাবোধ এবং শেখ মুজিব ও তাঁর  সহকর্মীদের বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের ব্যাক্তিগত ক্ষোভের কারণে সামরিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে দাবি করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার ঘটনা ততক্ষণে সারাবিশ্বে আলোড়ন তৈরি করে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়- ‘শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারবর্গের মৃত্যু সংবাদ যদি সমর্থিত হয় তা’ হলে এদেশে তা’ ব্যাপকভাবে দুঃখজনক বলে বিবেচিত হবে। মুজিব বহুল পরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় ‘স্টেটসম্যান’ (রাজনীতিজ্ঞ ব্যাক্তি) ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। (দি গার্ডিয়ান, লন্ডন, ১৬ আগস্ট)।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরের দিন ‘দি টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনীতে বলা হয়- ‘সব কিছু সত্তে¡ও শেখ মুজিব স্মরনীয় হয়ে থাকবেন এজন্য যে, তাকে ছাড়া বাংলাদেশ কখনও বাস্তবে পরিণত হত না।’ সারাবিশ্বে পত্র পত্রিকায় বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর স্তুতি তুলে ধরে তার মৃত্যুর খবর তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধুর সাময়িক প্রস্থান হয়ত ১৫ আগস্ট অপশক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর ব্যক্তিত্ব হাজার বছর বাঙালি জাতি স্মরণ করবে।

বিবিসি টেলিভিশনের দূর প্রাচ্য সংবাদদাতা ব্রায়ান ব্যারন বঙ্গবন্ধু হত্যার কয়েকদিন পর ২৮ আগস্ট, ১৯৭৫ ‘দি লিসনার’ পত্রিকার লিখিত বিবরণীতে বলেন, ‘শেখ মুজিব সরকারিভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং জনসাধারণের হৃদয়ে উচ্চতম আসনে প্রতিষ্ঠিত হবেন। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। এটা যখন ঘটবে, তখন নিঃসন্দেহে তার বুলেট-বিক্ষত বাসগৃহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারক-চিহ্ন এবং তার কবরস্থান পুণ্যতীর্থে পরিণত হবে।’

এর পর চলতে থাকে যে রাজনীতি তাতে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর নাম চিরতরে মুছে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাঁচানোর জন্য ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। সেদিন ছিল শুক্রবার। ‘দ্য বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর আছে। মোশতাকের স্বাক্ষরের পর অধ্যাদেশে তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএইচ রহমানের স্বাক্ষর আছে। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন। এর মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দেয়া হয়। এমনকি ভবিষ্যতে কেউ যাতে হত্যাকারীদের বিচার করতে না পারে সে ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়।

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই একটানা চেষ্টা চলে বঙ্গবন্ধুকে ভুলিয়ে দেয়ার। পাঠ্যপুস্তক থেকে মুছে ফেলা হয় বঙ্গবন্ধুর নাম। শাস্তির পরিবর্তে পুরস্কৃত করা হয় আসামিদের। ১৯৭৬ সালের ৮ জুন ১৫আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে অভিযুক্ত হত্যাকারীগোষ্ঠীর ১২ জনকে বিভিন্ন দূতাবাসে তাদের হত্যাযজ্ঞের অবদান অনুযায়ী চাকরি দেয়া হয়েছিল।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে যত সব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমরা জানি তাদের মধ্যে জঘন্যতম এই ১৫ আগস্ট। একটি ঘটনা প্ররোচিত করে আর একটা ঘটনাকে। ঠিক তেমনি ইতিহাসের নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর বাঙালিদের পরবর্তীতে আরো কয়েকটি নৃশংসতার মুখোমুখি হতে হয়। বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার কিছুদিন পরেই হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে, তারপর আসে এরশাদের স্বৈরাচার, পরবর্তীতে বিএনপি জামাতের অপরাজনীতি ২০০৪ সালের  নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। দেশে জঙ্গি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টাও চলে অনেকদিন।

আজ হয়ত তিনি (বঙ্গবন্ধু) স্বশরীরে নেই, ততে তার বাংলাদেশ যতদিন আছে পৃথিবীর মানচিত্রে ঠিক ততদিনই তিনি থাকবেন এদেশের মানুষের মাঝে। আজ থেকে যতদিন পর্যন্ত বাঙালি জাতি যেখানেই যাবে পৃথিবীর সব জায়গাতেই, সব কথাতেই থাকবে একটি নাম ‘বঙ্গবন্ধু’। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি মহান এ নেতা যে চিরদিন বাঙালীদের অন্তরে থাকবেন তা তিনি জানতেন। তাইতো, ১৯৬৯ সালের ৩০ ফেব্রæয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সংবর্ধনার জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই বলে মোর পরিচয় হোক আমি তোমাদেরই লোক।’

লেখক: সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ। এম ফিল (২০১৮-১৯), ড. ওয়াজেদ রিচার্স ইনস্টিটিউট, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।



আজকের রংপুর


No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image






 

 

 

 

 

 
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাহবুব রহমান
ইমেইল: mahabubt2003@yahoo.com