শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বার ২০২২   Friday, 30 September 2022.  



 বাংলাদেশ


আমাদের প্রতিদিন

 Feb-27-2022 08:07:48 PM


 

No image


ড. মো. মাহমুদুল আলম:

নারী জারণের লেখিকা ও মুসলিম সমাজের সংস্কারক বেগম রোকেয়া। তাঁর জীবনী ও রচনা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন প্রগতির দিকদিশা। তিনি মুসলিম নারী সমাজকে ধর্মের গোঁড়ামি থেকে বের করার চেষ্টা করেছেন। সমাজ থেকে অন্ধবিশ্বাস, ভ্রান্ত ধর্মীয় আচরণ ও কুলীনপ্রথা দুর করতে পত্র-পত্রিকা, সভা-সমিতি, বালিকা প্রতিষ্ঠান স্থাপনসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজ করেছেন। তাঁর ইসলাম বিষয়ে মন্তব্যগুলো অনেকে ভিন্নচোখে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। অনেকে তাঁকে নারীবাদী লেখিকাদের সাথে তুলনা করেছেন। তারা বুঝেনি নারীবাদ কি? তাঁর রচনা সমগ্র স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ইসলামের প্রগতি চিন্তাকে সাহিত্য রসে উপস্থাপন করেছেন। আকীদা, ধর্মীয় আমল, পর্দা, মেলামেশা, সাহিত্য চর্চা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর ইসলামের উদার দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। ইসলাম সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা সাগর সম। তাঁর রচিত বিভিন্ন প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা ইত্যাদিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

পিপাসা প্রবন্ধে লেখিকা পিপাসার বিভিন্ন ক্ষেত্র তুলে ধরেছেন। সেখানে কারবলার প্রান্তরে ইমাম হোসেন পরিবারে মর্মান্তিক পিপাসার বর্ণনা দিয়েছেন। ইমাম হোসেন, আলী আকবর, কন্যা সকিনা, ফাতেমা,  কাসেম, শহরবানু, জয়নব সবার পানির পিপাসা ও শহীদদের বিবরণ মর্মস্পর্শী ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তিনি ইমাম হোসেনের পিপাসার বিবরণ দিয়ে বলেন,

বীর হৃদয়! একবার হোসেনের বীরতা সহিষ্ণুতা দেখ! ঐ দেখ, তিনি নদীবক্ষে দাঁড়াইয়া-আর কোন যোদ্ধা নাই, সকলে সমরশায়ী, এখন যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি একা। তিনি কোন মতে পথ পরিষ্কার করিয়া নদী পর্যন্ত গিয়াছেন। ঐ দেখ অঞ্জলি ভরিয়া জল তুলিলেন, বুঝি পান করেন; না, পান ত করিলেন না!- যে জলের জন্য আসগর তাঁহারই কোলে প্রাণ হারাইয়াছে, আকবর তাঁহার রসনা পর্যন্ত চুষিয়াছেন- সেই জল তিনি পান করিবেন? না, -তিনি জল তুলিয়া দেখিলেন, ইচ্ছা করিলে পান করিতে পারেন। কিন্তু তাহা না করিয়া নদীর জল নদীতেই নিক্ষেপ করিলেন! বীরের উপযুক্ত কাজ। -(পিপাসা)

তাঁর এ উক্তি মীর মোশারফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু কে উতরে গেছে। নবী পরিবারের প্রতি কতটুকু গভীর ভালোবাসা থাকলে এমন ভাষাজ্ঞান আসতে পারে তা জ্ঞানীমহলেই জানেন। তিনি কারবালার হৃদয়স্পর্শী কাহিনেকে কেন্দ্র করে শিয়া-সুন্নীর দ্বন্দ্বের কারণ এবং তা নিরসন করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন,

শিয়াদের বাহ্য আড়ম্বর সুন্নিগণ ভাল মনে করেন না। বক্ষে করাঘাত করিলে বা শোক-বস্ত্র পরিধান করিলেই যে শোক করা হইল, সুন্নিদের এরূপ বিশ্বাস নহে। মতভেদের কথা এই যে, শিয়াগণ হযরত আয়ষা-ফাতেমার বিমাতা সিংহাসন আলীকে না দিয়া মোয়াবীয়াকে দিয়াছেন বলিয়া আয়ষাকে নিন্দা করে। আমরা আয়ষার (আলীর সৎশাশুড়ি হওয়া ব্যতীত আর) কোন দোষ দেখি না। চতুর্থ খলিফা কে হইবেন, ধর্মগুরু মোহাম্মদ (দ) তাঁহার নাম স্পষ্ট না বলিয়া অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া দেখাইয়াছেন। সে নির্দিষ্ট ব্যক্তি মোয়াবীয়া কিম্বা আলী তাঁহারা উভয়ে একই স্থানে দণ্ডায়মান ছিলেন। তাই মতভেদ হইল। কেহ বলিল ‘চতুর্থ খলিফা মোয়াবীয়া, কেহ বলিল ‘আলী

আয়ষা হিংসা করিয়া বলেন নাই, সিংহাসন মোয়াবীয়া পাইবেন। তিনি ঐ অনুমানের কথাই বলিয়াছিলেন মাত্র। সুন্নিগণ মাননীয়া আয়ষার নিন্দা সহ্য করিতে পারে না। শিয়া সুন্নিতে এইটুকু কথার মতভেদ। এই বিষয় লাইলাই দলাদলি। -(পিপাসা)

শত শত বছর ধরে শিয়া-সুন্নির দলাদলি, সংঘাত নিরসনের জন্য লেখিকা ইসলামের একটি চিরসত্য বাণী সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। নবী মোহাম্মদের (দ) সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিয়েছেন। উম্মুল মোমেনিন হযরত আয়ষা (রা) কে দোষের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

তিনি ‘পিপাসা প্রবন্ধে সৃষ্টির সবার মাঝে পিপাসা দেখেছেন। জলে সবার পিপাসা মিটে। কিন্তু সাগর তারও পিপাসা রয়েছে। তার গভীর গর্জনেও ‘পিপাসা, পিপাসা। এ পিপাসা নিবারণের জন্য সবাই ব্যস্ত। কিন্তু এ পিপাসা কোথায় নিবারণ হবে? কিভাবে নিবারণ হবে? তার সমাধানে তিনি বলেন,

আমি তবে বাতুল নহি। আমি যে পিপাসা দেখি, তাহা সত্য-কল্পিত নহে! আমি পিপাসা শুনি, তাহাও সত্য-কল্পনা নহে! ঈশ্বর প্রেম, এ বিশ্বজগৎ প্রেম-পিপাসু। -(পিপাসা)

স্রষ্টার প্রতি তাঁর ভালোবাসা, প্রেম কতখানি গভীর তা এ বাণীর মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। তিনি ¯্রষ্টার প্রেমের মাঝে পিপাসা নিবারণের ঠিকানা পেয়েছেন। সৃষ্টির মাঝে পিপাসা নিবারণের ঠাঁই নেই।

মানব সমাজ গঠনের জন্য আল্লাহ পাক আদমের স্ত্রী হিসাবে হাওয়া (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। উভয় থেকে সৃষ্টি করেছেন অগনন মানুষ। উভয়ের মর্যাদা একই। স্ত্রী কখনও স্বামীর দাসী না, বরং অর্ধাঙ্গী। দাম্পত্যজীবনে স্ত্রীকে দাসীর মতো ব্যবহার করা ইসলাম সমর্থন করে না। বেগম রোকেয়া এই চিরসত্যকে নারী জাতির সামনে এভাবে উপস্থাপন করেছেন-

আদিমকালের ইতিহাস কেহই জানে না বটে; তবু মনে হয় যে পুরাকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল না। কোন অজ্ঞাত কারণবশত মানবজাতির এক অংশ (নর) যেমন ক্রমে নানাবিষয়ে উন্নতি করিতে লাগিল, অপর অংশ (নারী) তাহার সঙ্গে সঙ্গে সেরূপ উন্নতি করিতে পারিল না বলিয়া পুররুষের সহচারী বা সহধর্মিনী না হইয়া দাসী হইয়া পড়িল। -(স্ত্রীজাতির অবনতি)

তিনি এ উক্তির মাধ্যমে নারীজাতির অতীত গৌরবের কথা স্মরণ করেছেন। ইসলাম এটাই সমর্থন করে। তিনি নির্বোধ স্ত্রীজাতি সম্পর্কে বলেন,

নির্বোধ স্ত্রীলোকের কর্তব্য যে প্রত্যেক বিষয়ে নিজেকে অবিশ্বাস করিয়া স্বামীর আদেশ পালন করে।-(স্ত্রীজাতির অবনতি)

ঘুমন্ত নারীজাতিকে তিনি সমাজের অন্ধকার থেকে এভাবে বের করতে চেয়েছেন। পরিবারে স্ত্রীর ভূমিকা কি হতে পারে তার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি নারীকে পরিশ্রমী হতে বলেছেন। শুধু ঘরের কাজে নয় সমাজেরও কাজ করতে বলেছেন। আর ইসলামও এটা সমর্থন করে। ইসলামে নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ। অথচ বাঙালি মুসলিম নারী সমাজে এর উল্টা রীতি প্রচলিত। তিনি নারীজাতিকে এ অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের আলোয় আহবান করেছেন। তিনি বলেছেন,

স্ত্রীশিক্ষার বিরুদ্ধে অধিকাংশ লোকের কেমন একটা কুসংস্কার আছে যে তাঁহারা ‘স্ত্রীশিক্ষা শব্দ শুনিলেই ‘শিক্ষার কুফলের একটা ভাবী বিভীষিকা দেখিয়া শিহরিয়া উঠেন। অশিক্ষিত স্ত্রীলোকের শত দোষ সমাজ আনবদনে ক্ষমা করিয়া থাকে, কিন্তু  সামান্য শিক্ষাপ্রাপ্তা মহিলা দোষ না করিলেও সমাজ কোন কল্পিত দোষ শতগুণ বাড়াইয়া সে বেচারির ঐ ‘শিক্ষার ঘাড়ে চাপাইয়া দেয় এবং শত কণ্ঠে সমস্বরে বলিয়া থাকে ‘স্ত্রীশিক্ষাকে নমষ্কার!

আজি কালি অধিকাংশ লোকে শিক্ষাকে কেবল চাকরি লাভের পথ  মনে করে। মহিলাগণের চাকরি গ্রহণ অসম্ভব সুতরাং এই সকল লোকের চক্ষে স্ত্রীশিক্ষা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক।-(স্ত্রীজাতির অবনতি)

এভাবে বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। মুসলিম নারীকে জ্ঞানের তরীতে জীবন পাড়ি দিতে বলেছেন। তাঁদেরকে অলস হয়ে ঘরে বসে থাকতে নিষেধ করেছেন। তাঁদেরকে চাকরি-ব্যবসা সব করতে বলেছেন। তিনি বলেন,

উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামীর গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসা করিতে পারিব না?”-(স্ত্রীজাতির অবনতি)

তিনি এক্ষেত্রে নারীজাতিকে তাঁদের গৌরবগাথাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “এবং এমন একদিন ছিল, যখন অন্যান্য দেশের মুসলমানসমাজে ‘স্ত্রীদার্শনিক, স্ত্রীঐতিহাসিক, স্ত্রীবৈজ্ঞানিক, স্ত্রীবক্তা, স্ত্রীচিকিৎসক, স্ত্রীরাজনীতিবিদ প্রভৃতি কিছুরই অভাব ছিল না। কেবল বঙ্গীয় মোসলেমসমাজের ওরূপ রমণীরত্ন নাই।-(স্ত্রীজাতির অবনতি)

তিনি নারীজাতিকে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমাজের কাজ করতে বলেছেন। কেননা তারাও সমাজের অঙ্গ। ইসলামও এটাই সমর্থন করে। নারী সাহাবিগণ ব্যবসা করতো, মাঠে কাজ করত, শিক্ষিতগণ জ্ঞান বিতরণ করতেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) এর স্ত্রী বাজারে ব্যবসা করতেন, হযরত আয়শা, উম্মে সালমাসহ (রা.) হাদীস বর্ণনা করতেন। বেগম রোকেয়া ইসলামের এই শিক্ষাকে বাঙালি মুসলিম নারীর মাঝে দেখতে চেয়েছিলেন।

পরিশেষে বলা যায়, বেগম রোকেয়া নারীবাদি লেখিকা নন; তিনি নারীজাগরণের লেখিকা; নারীমুক্তির অগ্রদূত। কুরআন ও হাদীসের উদার ও প্রগতি দৃষ্টিভঙ্গি তার রচনায় ফুটে উঠেছে। তাঁর ইসলামি চেতনা  অগ্নিগিরির জলন্ত লাভা, কলমের খুরধার সমুদ্র জলরাশি, পর্দানশীল জীবন চরিত্র কাননের গোলাপ। তাঁর তুলনা তৎকালীন মুসলিম নারী সমাজে পাওয়া দুষ্কর।

লেখক: সহকারি অধ্যাপক, ধডি সাতগাড়া বায়তুল মুকাররম মডেল কামিল মাদ্রাসা, রংপুর।



আজকের রংপুর


No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image






 

 

 

 

 

 
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাহবুব রহমান
ইমেইল: mahabubt2003@yahoo.com