শুক্রবার, ২০ মে ২০২২   Friday, 20 May 2022.  



 উপসম্পাদকীয়


আমাদের প্রতিদিন

 Mar-23-2022 05:41:34 PM


 

No image


মোঃ রুপাল মিয়া:

মিজান সাহেব বাজার থেকে বেশ কিছু পণ্য কিনে বাড়িতে ফিরেন। বাড়িতে ফেরার পর তার বড় ছেলে পণ্য ক্রয়ের রসিদ দেখে বলে এই পণ্যটাতে বেশি দাম রেখেছে। মিজান সাহেব বলেন বল কি? তার ছেলে বলে সরকার নতুন করে এই পণ্যের দাম নির্ধারণ করেছে এটা মনেহয় আপনার জানা নেই। মিজান সাহেব বলেন, না আমি তো জানিনা। এরপর মিজান সাহেব পণ্যটি নিয়ে আবার বাজারে যান এবং বিক্রেতাকে বলেন এই পণ্যের দাম বেশি রেখেছেন। বিক্রেতা বলেন, না সঠিক দামই রেখেছি। এরপর দুজনের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা শুরু হলে একজন সচেতন লোক তাদের কাছে গিয়ে জানতে চান বাক-বিতণ্ডার কারণ। মিজান সাহেব তার বিষয়টা সচেতন লোকটিকে বিস্তারিত বলেন। সচেতন লোকটি বিক্রেতাকে বলেন, আপনি দাম বেশি রেখেছেন কেন? আমিও জানি এটার দাম এত টাকা নয়। বিক্রেতা আবারও বলেন, আমি সঠিক দামই রেখেছি। এর কম দামে আমি বিক্রি করতে পারবো না। মিজান সাহেব বলেন, তাহলে পণ্যটি নিয়ে আমাকে টাকা ফেরত দিন। বিক্রেতা বলেন, বিক্রিত পণ্য ফেরত নেয়া হয় না। সচেতন লোকটি মিজান সাহেবকে বলেন, আপনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের বলে একটি অভিযোগ করেন। এরপর মিজান সাহেব সচেতন লোকটির কথামত প্রমাণসহ নির্দিষ্ট ফর্মে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে একটি  অভিযোগ করেন। কিছুদিন পর কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় বিক্রেতাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জরিমানা করে এবং ঐ অর্থের ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে (মিজান সাহেব) প্রদান করে।

দৈনন্দিন জীবনে মানুষকে বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করতে হয়। শুধু মিজান সাহেব নন। বাংলাদেশের হাজার হাজার নাগরিক পণ্য ক্রয় করতে গিয়ে এরুপ প্রতাণার শিকার হন। কিন্তু তারা জানেন না যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের মাধ্যমে এই প্রতারণার প্রতিকার পাওয়া যায়।

নাগরিকদের সুন্দরভাবে জীবন যাপনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভোক্তা অধিকার অন্যতম। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই ভোক্তা। কিন্তু ভোক্তা হিসেবে তার কি অধিকার আছে, প্রতারিত হলে কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে তা জানা নাই অনেক ভোক্তার। বিক্রেতারা যাতে কোনভাবেই ক্রেতাদের ধোঁকা দিতে না পারে, সে লক্ষ্যেই ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ এবং তাদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে সংসদ কর্তৃক গৃহীত ‘ভোক্তা-অধিকার ও সংরক্ষণ আইন ২০০৯ আইনটি ২০০৯ সালের ৫ এপ্রিল অনুমোদি হয়।

ভোক্তা অধিকার রিরোধী যেসব কার্যের কারণে ভোক্তা অভিযোগ করতে পারেন তা হলো-

(১) কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোন পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করা বা করতে প্রস্তাব করা।

(২) জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করা বা করতে প্রস্তাব করা।

(৩) মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মাকভাবে ক্ষতিকারক কোন দ্রব্য, কোন খাদ্য পণ্যের সাথে যার মিশ্রণ কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, উক্তরূপ দ্রব্য মিশ্রিত কোন পণ্য বিক্রয় করা বা করতে প্রস্তাব করা।

(৪) কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্য বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা।

(৫) প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রæত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা।

(৬) কোন পণ্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের সময়ে ভোক্তাকে প্রতিশ্রæত ওজন অপেক্ষা কম ওজনের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা।

(৭) কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওজন পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছু প্রকৃত দৈর্ঘ্য অপেক্ষা অধিক দৈর্ঘ্য প্রদর্শনকারী হওয়া।

(৮) কোন নকল পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করা বা করতে প্রস্তাব করা।

(৯) সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এমন কোন কাজ করা, যা কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণের ভিক্তিতে ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘণের জন্য যে সব দণ্ড আরোপ করা হয়-

(১) মোড়কবদ্ধ পণ্যের মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহার-বিধি সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাত করণের তারিখ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(২) দোকান বা প্রতিষ্ঠানের  সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা টানিয়ে প্রদর্শন না করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(৩) ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(৪) ভেজাল পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(৫) খাদ্য পণ্যের সাথে নিষিদ্ধ দ্রব্য মিশ্রিত করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(৬) অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করলে অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(৭) মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(৮) প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(৯) কম ওজনে পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(১০) ওজন পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্র প্রকৃত ওজন অপেক্ষা অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শন করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(১১) নকল পণ্য প্রস্তুব বা উৎপাদন করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(১২) মেয়াদ উত্তীর্ণ কোন পন্য বা ঔষধ বিক্রয় করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(১৩) সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা নিপন্নকারী কাজ করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(১৪) সেবা প্রদানকরীর অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসর্তকতা দ্বারা সেবা গ্রহীতার স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(১৫) কোন ব্যক্তি, কোন ব্যবসায়ী বা সেবা প্রদানকারীকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে হয়নানি মূলক মামলা দায়ের করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

(১৫) কোন দণ্ডিত ব্যক্তি যদি একই অপরাধ করেন তাহলে উক্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যে দণ্ড আছে তার দ্বিগুণ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

(১৬) এই ধারা সমূহে বর্ণিত দণ্ডের অতিরিক্ত, আদালত যথাযথ মনে করলে, অপরাধের সংশ্লিষ্ট অবৈধ পণ্য বা পণ্য প্রস্তুতের উপাদান, সামগ্রী ইত্যাদি রাষ্ট্রের অনুকূলে বায়েজাপ্তের আদেশ করতে পারেন।

তাই মিজান সাহেবের সাথে যেভাবে প্রতারণা করার চেষ্ঠা করা হয়েছিল আর যেন কাউকে এরুপ প্রতারণার শিকার হতে না হয় সেজন্য ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ সম্পর্কে দেশের সকল নাগরিককে সম্যক ধারণা লাভ করতে হবে। তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের নিজে থেকে আইনের ধারণা নেয়ার প্রবণতা কম। এজন্য এই আইনটির ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যমকেই বেশি ভমিকা পালন করতে হবে।

লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রংপুর।



আজকের রংপুর


No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image
No image






 

 

 

 

 

 
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাহবুব রহমান
ইমেইল: mahabubt2003@yahoo.com