সুরমা নদীতে বাঁধ দেয়ার আন্দোলনের কারণে ইলিয়াছ আলীকে গুম করা হয়েছে:মির্জা আব্বাস

2026-05-02 09:55:21

তিস্তা চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গণপদযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আমরা বকশিশ চাই না, ভিক্ষা চাই না। আমরা হিসাবের পাওনা চাই। আমরা ভারতের কাছে পানি ছাড়া অন্য কিছু চাই না। আমাদের হিসেবের পাওনা দিতে হবে। আজকে না হলে কালকে দিতে হবে। আমরা আদায় করে ছাড়বো। সুরমা নদীতে বাঁধ দেয়ার আন্দোলনের কারণে আমাদের প্রিয় গণমানুষের নেতা ইলিয়াছ আলীকে গুম করা হয়েছে। তাই বলে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার আন্দোলন থেমে যাবে না।

রোববার বিকেলে তিস্তা চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গণপদযাত্রার পূর্বে রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস রংপুরে এসব কথা বলেন।

মির্জা আব্বাস আরও বলেন, আমরা অনেক আগেই পানির ন্যায্য হিস্যা পেতাম। যদি হাসিনার মতো একটা সন্ত্রাসী সরকার না আসতো। এই পানি নিয়ে তারা ভারতের কাছে কিছু বলতে পারে নাই। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলো কিন্তু তাদের নতজানু পররাষ্ট্র নীতির কারণে তারা দেশের জন্য কোন মঙ্গল বয়ে আনেনি।

তিনি আরও বলেন, পানি কখনও মারণাস্ত্র হতে পারে না। পানি কখনও যুদ্ধের অস্ত্র হতে পারে না। একমাত্র ভারত বিশ্বে দেখিয়ে দিলো, পানি তারা যুদ্ধের ও মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি অমানবিক আচরণ। এই আচরণ সকল সভ্য রীতি-নীতিকে হার মানায়।

এ সময় তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের নেতা আসাদুল হাবীব দুলুকে উদ্দেশে করে সতর্ক করে বলেন, ‘দুলু উত্তরবঙ্গের একজন প্রতিবাদী মুখ। মাটি ও মানুষের নেতা। একজন কৃতি সন্তান। তাই দুলু তুমি সাবধানে থাকবে। তিস্তার আন্দোলন এখন এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের আন্দোলন। তোমার উপর শক্রদের দৃষ্টি পড়তে পারে। কেননা ভারত কখনও এই ধরনের প্রতিবাদ মুখ বুজে সহ্য করতে পারে না। ইতিপূর্বে শুধুমাত্র সুরমা নদীর বাঁধের জন্য আমাদের ইলিয়াছ আলীকে গুম করা হয়েছে। তাই তোমাকে সাবধানে পথ চলতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের কাছে ভারতের অনেক কিছু আছে। আমাদের কাছে ভারতের অনেক পোর্ট আছে। মংলা পোর্ট আছে, চট্টগ্রামে আছে। আমরা এগুলোর হিসেব করবো। হিসেব করার সময় এসেছে। আমাদের তিস্তার পানি দিতে হবে। ফারাক্কার পানি চাই। দিতে হবে। যেখানে যেখানে পানি দরকার সেখানে সেখানে পানি দিতে হবে। শুধুমাত্র সরকারের অপেক্ষায় আছি। দেশর মানুষ যদি রায় দেয় আর আমরা সরকার গঠন করলে ভারতের সাথে আলোচনা করেই আমাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিবো।  কিছুদিন আগে যে সরকার ছিলো, তারা সরকারে থেকেও ভারতের সাথে এসব হিসেব করেন নাই। তারা ছিল আপোষ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য।

গণপদযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলু’র সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন,  বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, রংপুর মহানগর বিএনপির আহবায়ক সামসুজ্জামান সামু, জেলা বিএনপির আহবায়ক সাইফুল ইসলাম, সদস্য সচিব আনিছুর রহমান লাকু, বিএনপি নেতা এমদাদুল হক ভরসাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

মির্জা আব্বাস এসময় তিস্তা নদী নিয়ে আন্দোলনের আয়োজনের প্রশংসা করেন এবং তিস্তা আন্দোলন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই আন্দোলনের সাথে থাকার অঙ্গিকার করেন। তিনি বলেন বিএনপি গণমানুষের রাজনীতি করে। কখনো আপোষ করে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয় না। সেই ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় আমরা এই আদায় করে ছাড়বো। যতদিন দাবি আদায় হবে ততদিন আন্দোলন চলবে।

এদিকে এই গণপদযাত্রাকে কেন্দ্র করে দুপুর ১ টার পর থেকেই তিস্তা নদী বেষ্টিত বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে লোকজন আসতে শুরু করে। সময় যত বাড়ে লোকজনের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে সেøাগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর এলাকা। সব শ্রেণিপেশার মানুষের যেন জনস্রোত এসে এসে মিশে এক মোহনায়। এসময় বন্ধ হয়ে যায় সকল সড়কে যানবাহন চলাচল। নগরীর প্রধান সড়কে তিস্তা বাঁচাই আন্দোলন গণপদযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের ঢল নামে। তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন আয়োজিত এ গণপদযাত্রা রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে রংপুর জিলা স্কুল মাঠ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষক সংগঠন, শ্রমজীবী মানুষ, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পদযাত্রাটিকে এক গণআন্দোলনে রূপ দেয়। এই গণপদযাত্রায় তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত প্লাকার্ড ও ব্যানার হাতে অংশ নেন নদীপারের মানুষসহ প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।  নগরীতে তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের স্লোগানে স্লোগানে মিছিলের ঢল নামে।

এর আগে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং অবিলম্বে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তিস্তাপারের মানুষজন ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি দু’দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে পাঁচ জেলার ১১ পয়েন্টে তাঁবু খাটিয়ে একই সময়ে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে সংহতি প্রকাশ করে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমাপনী অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে সবগুলো পয়েন্টে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ব্যতিক্রমধর্মী এই কর্মসূচিতে পাঁচ জেলার কয়েক লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেন। এরপরেও বর্তমান অন্তর্বতী সরকার এখন পর্যন্ত বিষয়টি আমলে নেয়নি। তাই আবারও নতুন করে দাবি আদায়ের জন্য এই কর্মসূচি পালন করা হলো।