রাজারহাটে ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে মানুষ কাতর

2026-01-07 01:29:48

প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট(কুড়িগ্রাম):  

‘কয়দিন থাকি এমন ঠান্ডা আর শীত, জারতে গাও মোর ঠর ঠর করি কাঁপে। মোক কায়ো একনা যদি গরম ধরার কম্বল দিলে হয় বাহে তাহলে তাঁর ছাওয়া পোয়া চিরদিন দুধে ভাতে থাইকতো।’ নিজের অজান্তেই কথা গুলো বললেন,কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার  ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খিতাবখাঁ বড়দরগা গ্রামের বানো মামুদ(৮২) বয়সী এক বৃদ্ধ। শুধু তিনি নন তার প্রতিবেশী  আছিয়া বেওয়া (৬০), আ.লতিফ( ৭০), আবেদ আলী(৭২) ও ধৌলি বেওয়া(৭৫) সহ অনেকে অতিরিক্ত ঠান্ডায় কাহিল হয়ে গরম কাপড়ের জন্য আকুতি করেন।  

গত দেড় সপ্তাহ ধরে  ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠান্ডায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চরাঞ্চলসহ মানুষের জিবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে।   এ অঞ্চলে তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৩ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠানামা করছে। কুড়িগ্রাম জেলার পাশে ভারতের আসাম মেঘালয় হওয়ায় হিমশীতল হাওয়া উত্তর থেকে দক্ষিণে ধাবিত হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ কাতর হয়ে পড়ছে। সন্ধ্যার পর নামছে ঘোর ঘনকুয়াশা। দুরের কোন কিছুই চোখে দেখা যায় না। ছিপ ছিপ বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ে রাস্তা-ঘাট ভিজে যায়। মনে হয় যেন এলাকায় বৃষ্টি হয়ে গেল। সেই সঙ্গে হিমেল বাতাসে মানুষ জড়োসড়ো হয়ে আছে।   বিশেষ কোন কাজ ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হতে চায় না।  কয়েকদিনের ঘন কুয়াশায় কপি, আলু, সিম, বেগুনসহ শীতকালিন শাক সবজি ছত্রাকসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ইরি-বোরো বীজতলা সাদা বর্ণ ধারণ করে মরে যাচ্ছে।  কৃষকরা এসব ফসল রক্ষার্থে কীটনাশক ব্যবহার করছেন।  সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে খেটে-খাওয়া, দিনমজুর ও নিম্ন ও মধ্যআয়ের শ্রমজীবী মানুষেরা। গবাদী পশু গরু-ছাগলের গায়ে উঠেছে পুরাতন জামাকাপড়। জ্বর,  সর্দি-কাশি, নিমোনিয়া ও পাতলা পায়খানায়  আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।   ইতোমধ্যে প্রায় সহস্রাধিক রোগী আউট ও ইনডোরে চিকিৎসা নিয়েছে বলে রাজারহাট স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডা. গোলাম রসুল রাখি জানিয়েছেন।  

রোববার (৪জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৯৯ শতাংশ বলে জানিয়েছে  রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার। রোববার বিকাল ৩টায় কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে সূর্য্যরে মুখ দেখা যায়নি। 

রাজারহাট ইউনিয়নের ফুলবাড়ি উপেনচৌকি গ্রামের অটোরিক্সা চালক শামছুল হক বলেন, ‘দিন যতো যাচ্ছে ঠান্ডা ততই বাড়ছে।  আজ রবিবার সকালে রিক্সা নিয়া বের হলেও অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে যাত্রী পাই নাই।  সকালে কলেজের ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া যায়। আজকে মাত্র দুইজন ছাত্রী পাইছি।’  

চাকিরপশার ইউনিয়নের পাঠক গ্রামের কৃষক মানিক মিয়া বলেন, ‘ইরি-বোরো বিছন পারছি(বীজতলা) কিন্তু অতিরিক্ত শীতের কারণে বিছনগুলা সাদা হয়ে মড়ে যাচ্ছে। শীতের ওষুধ দিছি কিছুই হয়নি।’ 

চাকিরপশার ইউনিয়নের চাকিরপশার তালুক ব্যাপারী পাড়া গ্রামের শ্রমিক শফিকুল ইসলাম, ‘আফাতার আলী বলেন, সকালে কাজত যাওয়া যায় না।   আজ রবিবার আরও বেশী ঠান্ডা আইলের কাচ কাটা কোদাল চালালে হাত পা শিষ্ঠা লাগে। কোদাল এমনি হাত থেকে খুলি পড়ে।’ 

শীতের এই তীব্রতায় কুড়িগ্রামের শীতার্ত মানুষ ও জনপ্রতিনিধিরা অবিলম্বে সরকারী ও বেসরকারীভাবে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র বিতরণ ও মানবিক সহায়তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।

রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রা এরকম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরের হিমেল বাতাস ও বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ সর্বোচ্চ হওয়ায় শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, বোরো বীজতলায় শীত থেকে রক্ষা পেতে প্রতি শতক জমিতে ২৮০ গ্রাম ইউরিয়া, ৪০০গ্রাম জিপসাম,২০ গ্রাম চিলেটেড জিংক স্প্রে করতে হবে। এবিষয়ে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে আসছি। 

রোববার (৪জানুয়ারী) রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল ইমরান বলেন, রাজারহাটে ৩লাখ মানুষের বসবাস।  এরমধ্যে ১লাখ মানুষ অসহায়। সরকারি ভাবে একসঙ্গে এতো মানুষকে সহযোগীতা করা সম্ভব হয় না। অসহায় মানুষের পাশে ব্যক্তিগত ভাবেও দাঁড়ানো যায়।  তাই আমি অনুরোধ করবো অসহায় শীতার্তদের পাশে সকলকে দাঁড়ানোর জন্য।