আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম:
ব্যাংকে একাউন্ট না খুলেও অভিনব প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কারা ভোগ করতে হলো কুড়িগ্রামের অসহায় বৃদ্ধ আনছার আলীকে। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে জাতীয় পরিচয় পত্রসহ ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে প্রতারণা ফাঁদে ফেলছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। আনছার আলীর ঘাড়ে এখন আদালতের খড়গ। ২ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাতের মিথ্যা মামলা।
অনুসন্ধানে দেখাযায়, হতদরিদ্র আনছার আলীর ভোটার আইডি দিয়ে প্রতারক চক্র কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকে একটি একাউন্ট খোলে গত বছরের ১জানুয়ারি। এরপর কুড়িগ্রাম কলেজ মোড়ের ঠিকানা ব্যবহার করে আনছার আলী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ভুয়া রিক্রটিং এজেন্সি খোলে। সেই এজেন্সি অফারে ওমরাহ পালনের বিজ্ঞাপন দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিজ্ঞাপনে দেয়া নাম্বারে রাজবাড়ী সদর উপজেলার শিক্ষক আবুল হাসান যোগাযোগ করে। সৌদি আরবে আসা-যাওয়া বিমান ভাড়া হিসেবে ৮জনের জনপ্রতি ৭৩হাজার ৫০০টাকা করে মোট ৫লাখ ৮৮হাজার টাকা ঠিক হয়। সেই হিসেবে আবুল হাসান রাজবাড়ী ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে গত ৯ অক্টোবর কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংক একাউন্টে ২লাখ ২০হাজার টাকা পাঠিয়ে দেয়। প্রতারক চক্র সেই টাকা তুলে নেয়। প্রতারিত হয়ে ২০ অক্টোবর রাজবাড়ী আদালতে ব্যাংক একাউন্টের ব্যক্তির নামে প্রতারণার একটি মামলা করে ভুক্তভোগী শিক্ষক। সেই একাউন্টে নাম্বারে তথ্য দেয়া ছিল আনছার আলীর। ওই মামলায় ওয়ারেন্ট জারি হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং জেল হাজতে প্রেরণ করে আনছার আলীকে। আনছার আলীর নামে ব্যাংক একাউন্ট খোলার সময় তার বাড়ির পাশেই শিরিনা বেগম নামে একজনকে নমিনী করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখাযায়,দরিদ্র অসহায় ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আনছার আলী কৃষি এবং অটো রিক্সা চালিয়ে পরিবারের ৫সদস্যের সংসার চালায় অতি কষ্টে ।
ঢাকার রাস্তায় দুটি শিশু তার অসুস্থ মা ফরিদা বেগমের মাথায় পানি ঢালার দৃশ্য দৈনিক যুগান্তরে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ২০১৯সালে। এঘটনা ভাইরাল হলে প্রশাসনের দৃষ্টি গোচরে আসে। সেই আলোচিত আনছার আলী-ফরিদা দম্পতির ২০১৬সালে নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ভিটেমাটিসহ তিনবিঘা কৃষি জমি হারিয়ে পাড়ি জমায় ঢাকায়। সামাজিক মাধ্যমে ছবি ভাইরাল হলে তৎকালীন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন আনছার আলী-ফরিদা বেগমকে ঢাকায় সরেজমিনে দেখে কুড়িগ্রাম নিয়ে এসে পুর্ণবাসন করেন। সরকারি ঘাস জমিতে বাড়ি করেদেন এবং রিক্সা কিনে দেয়া হয়।
এবার সেই আনছার আলী প্রতারকদের চক্রান্তে পড়ে বিনা অপরাধে এক সপ্তাহ কারা ভোগ করতে হয়েছে। স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে স্ত্রী ফরিদা বেগম ঋণ করে এখন আরও সর্বশান্ত।এই পরিবারটি এখন নানা অসহায়ত্বের মধ্যে দিনাতিপাত করছে । ঋণ আর মিথ্যা মামলার চাপে দিশেহারা।
আনছার আলী বলেন,গত নভেম্বর মাসে হঠাৎ পুলিশ এসে আমাকে নিয়ে যায়। এরপর আমি এক সপ্তাহ জেল খেটে বের হয়ে এসে জানতে পারি টাকা আত্নসাতের মামলা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। আমিতো কোন দিন পূবালী ব্যাংকে যাইনি এবং কোন একাউন্টও খুলিনি। ব্যাংকের ঐ স্বাক্ষরও আমার নয়। আমি লেখা পড়াও জানিনা। কিভাবে আমার ভোটার আইডি দিয়ে একাউন্ট খোলা হয়েছে এবং টাকা তোলা হয়েছে তা আমি জানি না। খেয়ে না খেয়ে আমাদের দিন চলে আমরা কিভাবে ব্যাংক একাউন্ট খুলবো?
আনছার আলীর স্ত্রী ফরিদা বেগম বলেন,স্বামীকে ছাড়াতে বাড়ির পাশে এক বোনের গরু বিক্রি করা ৫০হাজার টাকা এবং আরেকজনের নিকট ৫ হাজার টাকা ঋণ করে স্বামীকে জামিন করে আনছি। এখন ঋণের টাকা কেমনে শোধ করি কন। তারউপর গোদের উপর বিষফোঁড়া মথ্যা মামলায় দাবিকৃত ২ লাখ বিশ হাজার টাকা কোথায় পাবো। আমরা প্রতারণার শিকার। উল্টো আমার স্বামীর নামে
প্রতারণার মিথ্যা মামলা। এতো টাকা টাকা শোধ করি কিভাবে? রাজবাড়ীতে মামলার হাজিরা বা দেই কিভাবে? হামরা গরিব মানুষ তিন বেলা খাবার জোটে না সেখানে এই বিপদ থেকে কিভাবে রক্ষা পাই। বিচারক কি এ গরিবের কান্না আর কষ্টের কথা বুঝবে?
ভুক্তভোগী শিক্ষক আবুল হাসান মামলার কথা স্বীকার করে বলেন,এজেন্সি বিজ্ঞাপনে দেয়া নাম্বারে কথা হলে তারা আমাকে বিমানের টিকিট দেখায়। এরপর সেগুলো নিশ্চিত হয়ে তাদের দেয়া ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠাই। কিন্তু পরে দেখি টিকিট গুলো বাতিল করা হয়েছে। এরপর আমি বুঝতে পারি প্রতারক চক্রের খপ্পড়ে পড়েছি। তাই ব্যাংক একাউন্টের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছি। তবে এই আনছার আলীকে আমি চিনি না বা ইতিপূর্বে দেখা হয়নি।
ব্যাংক একাউন্টের নমিনী শিরিনা বেগম বলেন, আনছার আলীর পরিবার এবং আমি আবাসনেই থাকি। তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। অথচ ব্যাংক একাউন্ট খোলার সময় আমাকে নমিনী করা হয়েছে। আমি তো এগুলোর কিছুই জানিনা। আমার
অসুস্থ স্বামী প্রতিবন্ধি সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে আমাদের। আমরা সবাই প্রতারণার শিকার।
আবাসনের বাসিন্দা মজিরন বেগম বলেন,বৃদ্ধ আনছার আলী সরকারি আবাসনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনাপাতিত করছে। অথচ টাকা আত্নসাতের মিথ্যা মামলা হওয়ায় হতাশ প্রতিবেশিরাও। গরিব অসহায় এসব পরিবারকে বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা দেবার কথা বলে প্রতারক চক্ররা ভোটার আইডি নিয়ে যায়। এভাবে প্রতারণার ফাঁদে গরিব মানুষকে ফেলার দাবী স্থানীয়দের।
কুড়িগ্রাম স্টেশন ক্লাব সুপার মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক কায়েদী আজম মিলটন বলেন,আনছার আলী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল অফিসার্স ক্লাব মার্কেট কুড়িগ্রাম-চিলমারী রোডে যে ঠিকানা দেখানো হয়েছে তা ভুয়া। কেননা অফিসার্স ক্লাব মার্কেট নামে এখানে কোন মার্কেট নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিৎ তদন্ত করে এ প্রতারক চক্রকে সনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা।
রাজবাড়ী জজ কোর্টের আইনজীবি রঞ্জু বিশ্বাস বলেন,রাজবাড়ী জেলা দায়রা জজ আদালতে বাদী আবুল হাসান প্রতারিত হয়ে সিআর-১২৮৫/২৫ নং একটি মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল অফিসার এএইচএম আলমগীর কবির বলেন,আনছার আলীর নামে একাউন্টের মাধ্যমে প্রতারণা ঘটনা ঘটেছে তা সমাধানের চেষ্ঠা চলছে। এছাড়াও প্রান্তিক জনগোষ্টিকে বিভিন্ন ভাবে প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যরা ভোটার আইডি,ছবিসহ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে প্রতারণা ফাঁদ ফেলে। ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান সকলকে সচেতন হবার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।