কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা আর চারদিকে নদীবেষ্টিত নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জীবন যেন প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। শহরের তুলনায় বহুগুণ বেশি কষ্টে দিন কাটাচ্ছে নদীঘেরা এসব এলাকার মানুষ। সীমিত আয়ের কারণে অনেকের পক্ষেই শীত নিবারণের ন্যূনতম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। সরকারি সহায়তা খুবই অপ্রতুল। ফলে অধিকাংশ মানুষের ভাগ্যে জোটেনি সরকারি কম্বল।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রর পর্যবেক্ষক ফজলে রহমান বলেন, শনিবার ভোর ৬ টায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুপুর ১২ টায় তা ছিলো ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর তাপমাত্রা আবার কমতে থাকে। মুলত সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত তাপমাত্রা কম থাকে। কুয়াশা এবং হিমেল হাওয়ার কারণে প্রচন্ড ঠান্ডা অনুভূত হয়। চর এবং নদীর অববাহিকায় কুয়াশা এবং ঠান্ডার প্রভাব বেশি থাকবে। এ অবস্থা চলবে আরো কয়েকদিন।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন চিলমারী ইউনিয়নের কড়াই বরিশাল চরে প্রায় দুই শতাধিক অসহায়, দুস্থ ও শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়। জেলা চর উন্নয়ন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচি শুধু শীত নিবারণের সহায়তা নয়, বরং চরবাসীর প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার কথাও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন,
“চরের মানুষ বছরের পর বছর ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। শীত, বন্যা কিংবা খাদ্যসংকট—সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে চরাঞ্চলের মানুষ। আজ আমরা কম্বল দিচ্ছি, কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। চরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।”
তিনি আরও বলেন,
“যেভাবে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে, ঠিক সেভাবেই দেশের চরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অবিলম্বে একটি চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা প্রয়োজন। এটি কেবল একটি দাবি নয়, এটি মানবিক অধিকার।”
চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠী দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। একইভাবে দেশের ৩২টি জেলার প্রায় ১০০টি উপজেলার নদীতীরবর্তী চর ও দ্বীপচরের প্রায় দুই কোটি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন সময়ের দাবি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন এর জেলা সভাপতি খাইরুল আনম বলেন, চরাঞ্চলের সমস্যাগুলো সাধারণ উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। ভৌগোলিক বাস্তবতা ও জীবনযাত্রার ভিন্নতার কারণে চরবাসীর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা প্রয়োজন। আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমেই এসব সমস্যার টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, মানবিক এই উদ্যোগ শুধু শীতার্তদের গায়ে কম্বল জড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং চরবাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কষ্ট ও ন্যায্য দাবিগুলো নতুন করে জাতীয় আলোচনায় তুলে ধরেছে। জেলা চর উন্নয়ন কমিটির এই কার্যক্রম চরাঞ্চলের মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে এবং চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের মানবিক দাবি আরও জোরালো করে তুলেছে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য মতে হালকা শৈত্য প্রবাহ বিরাজমান থাকলেও সূর্যের তেজ সকাল থেকে প্রখর হওয়ায় সাধারণ মানুষ স্বস্তিত আছে। কৃষি কাজে গতি এসেছে।
জেলা প্রশাসকের দপ্তর সূত্রে জানাযায়, চলতি শীত মৌসুমে ২৫ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। নতুন করে ৪০ লাখ টাকার কম্বল কেনার প্রস্তুতি চলছে। পরে পর্যায়ক্রমে এসব কম্বল বিতরণ করা হবে।