মোঃ বুলবুল ইসলাম, খানসামা (দিনাজপুর):
"দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় ঝাড়বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি দখলকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে থাকা জমিতে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার পর সম্প্রতি পাকা স্থাপনা নির্মাণ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশ্যে সরকারি জমিতে এমন কর্মকাণ্ড চললেও তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঝাড়বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিদ্যালয়ের মোট ৫৪ শতাংশ জমির মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩৮ শতাংশ ব্যবহৃত হলেও খতিয়ান নং ৭২-এর ১৩২ দাগভুক্ত অবশিষ্ট ১৬ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই বেদখল জমিতে বছরের পর বছর ধরে হাট বসানো, দোকানপাট স্থাপনসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। বিষয়টি একাধিকবার আলোচনায় এলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে সেখানে পাকা ঘর নির্মাণ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এভাবে জমি দখল অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, খেলার মাঠ ও শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহেদ আলী বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের ১৬ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে রয়েছে। বারবার জানানো সত্ত্বেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। এখন পাকা ঘর নির্মাণ শুরু হওয়ায় আমরা চরম উদ্বিগ্ন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো জমিই হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. শাহজিদা হক জানান, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং জেলাতেও অবহিত করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমা খাতুন বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা আছে। দুই পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে, তবে কেউই এখন পর্যন্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। সেক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে জমির মালিক সরকার বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তারপরও কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য তাদের সময় দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে, জমির মালিকানা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন স্থানীয় হাট কমিটির সভাপতি।
হাট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, “আমি জন্মলগ্ন থেকেই এখানে হাট বসতে দেখেছি। তাই এটি হাটের সম্পত্তি বলেই মনে করি। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা কমিটি যদি বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারে, তাহলে হাট কমিটির পক্ষ থেকে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হবে।”
বাজারের দোকানদার রবিউল ইসলাম ও হিটলার বলেন, *“আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে ব্যবসা করে আসছি। তবে জমিটির প্রকৃত মালিক কে—তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। আগে আমরা দোকানের ভাড়া ঝাড়বাড়ি হাই স্কুল কর্তৃপক্ষকে প্রদান করতাম। পরে ঝাড়বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাই স্কুলের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে আমরা ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিই। বিগত সরকারের সময় দুইজন সংসদ সদস্য আমাদেরকে যেভাবে আছি সেভাবেই থাকতে বলেন। এরপর থেকে আমরা একইভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।
তারা আরও বলেন, যদি কোনো কারণে দোকানঘর উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে যেন তাদের জীবিকা ব্যাহত না হয় এবং বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এ ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।”*
এ বক্তব্যের ফলে জমির মালিকানা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জমি উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে হাট কমিটি ঐতিহ্যের ভিত্তিতে জমির দাবি করছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কাগজপত্রের ভিত্তিতে দ্রুত প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করে প্রশাসনের উচিত অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যদি জমির মালিক সরকারই হয়ে থাকে, তাহলে বছরের পর বছর ধরে সেখানে কীভাবে দখল ও স্থাপনা নির্মাণ চলেছে? এবং কেন এখনো এর স্থায়ী সমাধান হয়নি?
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বিদ্যালয়ের অবশিষ্ট জমিও দখল হয়ে যেতে পারে। এতে একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মারাত্মক সংকটে পড়বে।
এখন সবার দৃষ্টি প্রশাসনের দিকে—কথার বাইরে গিয়ে কত দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।