আসাদুজ্জামান সাজু ,লালমনিরহাট :
দেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক কাকিনা জমিদার বাড়িটি আজ পরিণত হয়েছে ধ্বংসপ্রায় এক নিদর্শনে। শতবর্ষী এই রাজবাড়ি ছিল একসময় ঐশ্বর্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু বর্তমানে সেটি পড়ে আছে অবহেলা ও অযত্নে—ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়।
লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরের পরিচালক ড. আশরাফুজ্জামান মন্ডল জানান, কাকিনা উত্তরবঙ্গের একটি সুপ্রাচীন জনপদ, যার ইতিহাস বহু শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত। তদানীন্তন ভারতবর্ষের উত্তর–পূর্ব প্রান্তে যে সভ্যতার লীলাভূমি গড়ে উঠেছিল, কাকিনা ছিল তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের পরিক্রমায় কাকিনা অঞ্চল কংকনা, কংকানিয়া, কানকিনা, কৈকিনা বা কাকিনিয়া—বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল।
তিনি বলেন, প্রায় তিনশ বছর আগে মোগল সম্রাটের দেওয়া সনদের মাধ্যমে কাকিনায় জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। জমিদার কাশীনাথ রায় ছিলেন এ পরিবারের প্রথম প্রভাবশালী নেতা। তিনি কৃষি, বাণিজ্য, স্থাপত্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজান। পরবর্তীতে জমিদার মহিমা রঞ্জন রায় ও শম্ভুচরণ রায় জমিদারির পরিধি ও প্রভাব আরও বাড়ান, যার ফলে কাকিনা অঞ্চল উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
কাকিনার কলেজ শিক্ষক ও কবি নুরুল আমিন জানান, কাকিনা জমিদার বাড়িটি স্থাপত্যশৈলীর অনন্য মিশ্রণে নির্মিত। ইউরোপীয় নকশা ও মোগল অলংকরণের সমন্বয় ছিল এর মূল বৈশিষ্ট্য। দোতলা মহার্ঘ প্রাসাদ, রাজদরবার, অতিথিশালা, হাওয়া খানা, গোপন পথ ও লুকানো আস্তানার নিখুঁত কারুকাজ আজও অতীতের ঐশ্বর্যের সাক্ষ্য বহন করে। ‘একসময় এ রাজবাড়িতে নিয়মিত আয়োজন হতো যাত্রা, নাটক, পুতুলনাচ, বৈঠকি গান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব। যার ফলে কাকিনা উত্তরবঙ্গের অন্যতম সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৯২৫ সালের দিকে আর্থিক সংকট, রাজস্ব জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে জমিদারি নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর বাড়িটির প্রতি সরকারি কিংবা প্রশাসনিক কোনও নজর না থাকায় দ্রুত নেমে আসে পতন। স্বাধীনতার পর অবহেলা, দখল ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের ফলে রাজবাড়ির বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
কাকিনার উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জমিদার মহিমা রঞ্জন রায় চৌধুরী। তিনি রংপুরে ‘বঙ্গ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিতি পায়। তার সময়েই কাকিনা জমিদারির আওতায় মহিমাগঞ্জ, তিস্তা, মহেন্দ্রনগর, লালমনিরহাট, আদিতমারী, মোগলহাট ও কাকিনা রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি রংপুর সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং থিয়েটার হল নির্মাণে জমি দান করে সংস্কৃতির প্রসার ঘটান।
বর্তমানে জমিদার বাড়ির ছাদ ধসে পড়েছে, দেয়ালে চওড়া ফাটল দেখা দিয়েছে। রাজদরবার, অতিথিশালা, গোপন কক্ষ ও প্রাসাদের অধিকাংশ অংশ ভগ্নদশায় পড়ে আছে। একসময় যে প্রাসাদে আলো–ঝলমলে সাংস্কৃতিক আসর বসত, এখন সেখানে নীরবতা আর অতীত স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছুই নেই।
কাকিনা উত্তর বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রউফ সরকার জানান, জমিদার বাড়ির প্রাণকেন্দ্রে এখন গড়ে উঠেছে জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ—উত্তর বাংলা কলেজ। পাশেই রয়েছে রাজা মহিমার স্মৃতিবিজড়িত কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়। এছাড়া আছে কাকিনা জনমিলন কেন্দ্র, মিশন হাউস, কাচারি ঘর ও ঐতিহাসিক হাওয়া খানা—যা রাজবাড়ির কিছু অংশকে আজও টিকে থাকার শক্তি জুগিয়ে রেখেছে।
’দ্রুত সরকারি উদ্যোগে কাকিনা জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, ঐতিহাসিক এই স্থাপত্য নিদর্শনটি সংস্কার করা গেলে লালমনিরহাটে পর্যটন খাতের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যকে অযত্নে হারিয়ে যাওয়ার আগে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা জরুরি বলে দাবি কবরেন কলেজের অধ্যক্ষ।
রংপুর বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল বলেন,“আমরা কাকিনা জমিদার বাড়ী সম্পর্কে জেনেছি। উত্তর বাংলা কলেজের কারনে কিছু প্রাচীন স্থাপনা রক্ষা পেয়েছে। আমরা ওই এলাকা পরিদর্শন করে প্রাচীন জমিদার বাড়ীটিকে প্রত্নতত্ব বিভাগের অধীন সংরক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহন করবো।’