নির্মল রায়:
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তা নদীতে ভয়াবহ পানি শূন্যতা দেখা দিয়েছে। একসময় প্রবল স্রোতে ভরপুর থাকা নদীটি এখন পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ বালুচরে। নদীর বুকজুড়ে ধূ-ধূ বালির চরে পড়ে আছে অসংখ্য নৌকা, যা একসময় ছিল স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুম এলেই তিস্তার পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ফলে নদীর অনেক অংশ এখন হাঁটাপথে পার হওয়া যায়। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলে সম্প্রদায়ের মানুষজন। অনেকেই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নদীতীর ঘুরে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে জেগে উঠেছে বড় বড় চর। সেখানে পড়ে আছে নৌকা, জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম। নদীপাড়ের জেলেরা অলস সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ তাদের কাজের কোনো সুযোগ নেই। অনেক পরিবার অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
লক্ষীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লা আল হাদী বলেন,
তিস্তা নদীর এই করুণ চিত্র আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি থাকে না, আবার বর্ষা এলেই হঠাৎ পানি বেড়ে বন্যা ও ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এতে শত শত ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। এটি বাস্তবায়ন হলে নদীর নাব্যতা ফিরবে এবং কৃষি ও জীবিকা—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও বলেন,
তিস্তা পাড়ের মানুষ বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত। আমরা জনপ্রতিনিধিরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—এই অঞ্চলের মানুষের স্বার্থে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা রবি দাস বলেন,
“আগে তিস্তা নদীতে সারাবছর পানি থাকত। আমরা নৌকা চালাতাম, মাছ ধরতাম—ভালোই চলত। এখন নদীতে পানি নেই, নৌকা মাটিতেই পড়ে থাকে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।”
বাতেন মিয়া বলেন,
“নদীটা এখন আর নদীর মতো লাগে না, মরুভূমির মতো লাগে। আমরা যারা নদীর ওপর নির্ভর করি, তাদের জন্য এটা খুব কষ্টের। সরকার যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তাহলে হয়তো আবার আগের মতো নদী ফিরে পাব।”
কৃষক মানিক মিয়া বলেন,
“পানি না থাকায় কৃষিকাজেও সমস্যা হচ্ছে। সেচের জন্য পানি পাওয়া যায় না। ফলে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আমরা আরও বিপদে পড়ব।”
এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উজানে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়েই তিস্তার বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তিস্তা পাড়ের বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একযোগে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসবে, বন্যা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং তিস্তা পাড়ের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকায় স্বস্তি ফিরবে।