নিজস্ব প্রতিবেদক:
বোরো চাষের প্রধান চাহিদা সেচ ব্যবস্থা, যার অধিকাংশই নির্ভর করতে হয় জ্বালানি তেল ডিজেলের উপর। কিন্তু এবছর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাথে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটে বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। যার প্রেক্ষিতে রংপুরে তীব্র জ্বালানি সংকটে কৃষিতে সেচের চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ডিজেলের অভাবে প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে সেচ পাম্প। ফেটে যাচ্ছে বোরো ধান ক্ষেত। এতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন কৃষক।
এদিকে জমিতে সময়মতো সেচ দিতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।
রংপুরের গংগচড়া ও মিঠাপুকুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ডিজেলের অভাবে অধিকাংশ সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে। সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। এতে ফসল নষ্টের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, বোরো ধানের জমিতে নিয়মিত সেচ জরুরি। ডিজেল না থাকায় জমিতে সেচ না দেয়ার কারণে জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। আগে সহজেই ডিজেল পাওয়া গেলেও এখন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না তারা। অনেক ক্ষেত্রে দুই-তিন লিটারের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। যা দিয়ে কয়েক ঘণ্টাও সেচ চালানো সম্ভব নয়।
গংগাচড়া উপজেলার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “জমিতে পানি দিতে না পারলে সব শেষ হয়ে যাবে। তেল না পেয়ে এখন আমরা অসহায়।”
একই উপজেলার আরেক কৃষক সাত্তার মিয়া বলেন, বোতল নিয়ে তেল নিতে গেলে পাম্পের ম্যানেজার বলেন, “বোতলে হবে না, শ্যালো মেশিন নিয়ে আসেন তারপর তেল দেওয়া হবে।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, “বাবা স্যালো মেশিন নিয়ে কী পাম্পে যাওয়া যায়? আমরা কৃষক মানুষ এত টাকা খরচ করি কীভাবে নিয়ে যাব? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের আর আবাদ করা হবে না।”
‘এরপরও ধান ক্ষেত বাঁচাতে শ্যালো মেশিন নিয়ে কোনো কোনো কৃষক পাম্পে যাচ্ছেন। আর এতে কৃষকের সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।’
মিঠাপুকুর উপজেলার রানিপুকুরের রাশেদুল, মনিরুজ্জামান, রুহুল আমিন, নুরুজ্জামান, মিন্টুসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, “আমরা তেল নির্ভর সেচ দেই কৃষি জমিতে। কিন্তু তেল না পাওয়ায় আমরা জমিতে সময় মতো সেচ দিতে পারছিনা। এদিকে বৃষ্টিও নেই যে সেচের বিকল্প কাজ হবে। যদি বৃষ্টি হয় তবে আবাদ ভালো হবে নচেৎ নয়।”
তারা আরো বলেন, ‘সরকারের উচিত আমাদের সেচের জন্য স্পেশালভাবে তেল সরবরাহ করা।’
কৃষি বিভাগ থেকে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলের বেশিরভাগ সেচ ব্যবস্থা ডিজেল নির্ভর। কিন্তু বর্তমান সংকটে সেচ কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এবারে এ জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
কৃষিবীদরা বলছেন, “সেচের অভাবে ধানক্ষেত শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, যা বোরো ধান উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে জ্বালানি সংকটে (ডিজেল) সেচের কারণে ধানের গাছ হলুদ ও লাল হয়ে মারা যাচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসছে। এছাড়াও তীব্র পানির অভাবে জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, ফলে ধান গাছের শেকড় খাবার নিতে পারছেনা।”
কৃষক নেতারা বলছেন, এ সময় জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারলে বোরো ধানের ফলন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।
জ্বালানি সংকটের জন্য সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করে ক্ষেত মজুর পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, “সরকারের মনিটরিংয়ের অভাবে ডিজেলের সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ডিজেলের সংকট দেখাচ্ছে।”
সময়মতো ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশ ‘দুর্ভিক্ষের’ দিকে চলে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন এ ক্ষেত মজুর নেতা।
বিদ্যুৎচালিত সেচ ব্যবস্থায়ও ভরসা পাচ্ছেন না কৃষক। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেই ব্যবস্থাও কার্যকর হচ্ছে না। এতে সংকট আরও বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবীদ মোঃ সিরাজুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, “রংপুরে ডিজেলের কোন অভাব নেই, হে অকটেন বা পেট্রোলের কিছুটা সমস্যা রয়েছে। যদি কোথাও ডিজেলের সমস্যা হয় সেক্ষেত্রে আমাদের মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ রয়েছে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।”
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জানিয়ে রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “দ্রুত ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও কৃষকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে।”