৩ দশক পর আঙ্গুর চাষে সফল পীরগঞ্জের আবুল কালাম

2026-04-21 01:51:27

পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি :

দীর্ঘ প্রায় তিন দশক চেষ্টার পর আঙ্গুর চাষে সফলতা অর্জন করেছেন ঠাকুরগাঁয়ের পীরগঞ্জের চাষী আবুল কালাম আজাদ। তার বাগানের গাছে গাছে এখন থোকায় থোকায় আঙ্গুর ফল ঝুলছে। দূরদূরান্ত থেকে দেখতে আসছেন নানা বয়সের উৎসুক মানুষ। অনেকেই বাগান করার আগ্রহও প্রকাশ করছেন। এ বাগান থেকে এবার প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় হবে বলে জানিয়েছেন চাষী আবুল কালাম আজাদ। কৃষি বিভাগ বলছেন এখানকার মাটি ও আবহাওয়া আঙ্গুর চাষের উপযোগী হওয়ায় আঙ্গুর চাষ সম্প্রসারণে কাজ করবেন তারা।

পীরগঞ্জ উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের বসন্তপুর ঝোলঝলি বাজারের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ। জীবিকার তাগিদে ১৯৯৩ সালে সৌদিআরবে পাড়ি জমান। ফিরে আসেন ১৯৯৬ সালে। প্রবাসে থাকাকালে আঙ্গুর চাষের প্রতি আগ্রহ জাগে তার। সেখান থেকে আসার সময় আঙ্গুরের একটি লতা সাথে নিয়ে আসেন। রোপন করেন নিজ বাড়িতে। পরবর্তীতে সেটিতে আঙ্গুর ধরলেও স্বাদে ছিল টক। সে সময় ওই আঙ্গুর গাছ কেটে ফেলেন তিনি। এরপর যোগাযোগ করে বিভিন্ন স্থান থেকে আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করে রোপন করেন কিন্তু সেসব গাছের আঙ্গুরও মিষ্টি না হওয়ায় গাছ কেটে ফেলেছেন। মিষ্টি আঙ্গুর ফলাতে না পেরে দুই দশকের অধিক সময় ধরে আঙ্গুর গাছ লাগান এবং কেটে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন ইউটিউব ঘেটে বিদেশ থেকে মিষ্টি জাতের আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। ২০২৫ সালে সেসব চারা বাড়ির চারপাশের পতিত জমি এবং পুকুর পাড়ে রোপন করেন। কয়েক মাসে গাছগুলি লতা পাতায় বিকশিত হয়ে মাচা ছেয়ে ফেলে। ছয় মাসের মাথায় ফল আসে। আট নয় মাসের মাথায় তা পরিপক্ক হয়। সেই ফল হয় রসালো ও মিষ্টি । মিষ্টি আঙ্গুরের ভরপুর হয়ে উঠে তার বাগান। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সফলতা পান তিনি। পরের বছর আঙ্গুরের বাগান সম্প্রসারিত করেন। বর্তমানে চার বিঘা আয়তনের তার আঙ্গুর বাগানে ১২০০ আঙ্গুর গাছ রয়েছে। প্রায় প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ফল এসেছে। আগামী ১ থেকে দেড় মাসের মধ্যে এসব ফল বিক্রি করার উপযোগী হবে। সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে তার বাগান থেকে পাইকাররা আঙ্গুর নিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি। এরই মধ্যে পাইকারদের সাথে তার কথা হয়েছে। কিছু কিছু পাইকার বাগান দেখেও গেছেন। আশা করছেন প্রায় ১৫ লাখ টাকার আঙ্গুর বিক্রি করতে পারবেন।

বাগান মালিক আবুল কালাম আজাদ জানান, বর্তমান তার বাগানে বাইকুন, অ্যাপোলো, ব্ল্যাক ম্যাজিক, সিলভা, ব্ল্যাক জাম্বু, ব্ল্যাক ম্যাজিক,  সুলতানা অনুসরা, ভেলেজ ডিরসন সহ প্রায় ২২ প্রজাতির আঙ্গুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে বছরে দুইবার অর্থাৎ জুন-জুলাই এবং নভেম্বর- ডিসেম্বর মাসে ফলন পাওয়া যায়। আগামীতে এবারের দ্বিগুন ফলন পাবেন বলে আশা তার। বাগান করতে তার ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রথম বছরেই খরচের টাকা উঠে আসবে বলে অভিমত বাগান মালিকের। এরপর প্রতিবছর বাগান থেকে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা আয় করবেন তিনি। বাগানে তেমন কোন খরচ নেই। তিনি নিজে এবং দুইজন সহকারি নিয়মিত বাগান পরিচর্যা করেন। আঙ্গুর চাষ সম্প্রসারণে তিনি চারা উৎপাদন করেছেন। প্রতি চারা ৩ শ টাকায় বিক্রিও করছেন। তার বাগান দেখে আঙ্গুর চাষ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। এরই মধ্যে দেশে সাড়া জাগানো পীরগঞ্জের কমলা বাগান অরেঞ্জ ভ্যালীর মালিক আবু জাহিদ জুয়েলও ৩শ আঙ্গুর চারা নিতে বাগান মালিকের সাথে যোগাযোগ করেছেন বলে জানান কৃষি উদ্যোক্তা আবুল কালাম।

এদিকে উপজেলার বাশঁগাড়া গ্রামে একই নামের আরেক কৃষি উদ্যোক্তা আবুল কালাম গত বছর ২৫ শতক জমিতে আঙ্গুর বাগান করেছেন। তিনি মাগুরা জেলা থেকে  চারা সংগ্রহ করে বাগান করেছেন। বাগানের ২শ গাছের মধ্যে কয়েকটি গাছে গত ডিসেম্বরেই ফল আসে। এ বাগানের ফলও মিষ্টি হয় বলে জানান আবুল কালামের ভাতিজা জুলফিকার।

উপজেলার ঝলঝলি বাজারের বাসিন্দা বিক্রম সিংহ জানান, আঙ্গুরের বাগান দেখে তিনিও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ভাবছেন আঙ্গুরের বাগান করবেন।

নারায়নপুর গ্রামের মানিক হোসেন, জগথা গ্রামের বাদল হোসেনেরও একই রকম অভিমত ব্যক্ত করেন। তারাও আঙ্গুর বাগান করবেন বলে জানান।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানান, পীরগঞ্জে আঙ্গুর চাষ এরই মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এলাকার মাটি ও আবহাওয়া আঙ্গুর চাষের উপযোগী। তারা আঙ্গুর চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। কৃষকরা আঙ্গুর চাষ করলে ভালো লাভবান হবে বলে মনে করেন তিনি। আঙ্গুর বাগান করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে বলেও জানান এ কৃষিবিদ।