হাবিবুল হাসান হাবিব, ডিমলা (নীলফামারী):
নীলফামারীর ডিমলায় চলমান ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাবু হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী। জন্মলগ্ন থেকেই শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে তিনি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। জীবনের প্রতিটি ধাপে বাধার দেয়াল থাকলেও স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। উপজেলা প্রশাসনের মানবিক ও তাৎক্ষণিক উদ্যোগে সেই স্বপ্নযাত্রা আজ বাস্তবতার পথে এগিয়ে চলেছে।
বাবু হোসেন ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের দিনমজুর নজরুল ইসলামের ছেলে। পরিবারে দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। দারিদ্র্য ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। অভাব-অনটনের সংসারেও পড়ালেখাই ছিল তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। স্বপ্ন ছিল একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
তিনি জটুয়াখাতা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তিনি নিজ হাতে লিখতে পারেন না। ফলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং তার স্বপ্ন যেন থমকে যাওয়ার মুখে পড়ে।
পরীক্ষার প্রথম দিন ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান আদাবাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে বিষয়টি লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন, বাবু হোসেন পরীক্ষার হলে উপস্থিত থাকলেও লিখতে পারছেন না। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তাৎক্ষণিকভাবে তিনি হল সুপারকে ডেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জরুরি আবেদন করার নির্দেশ দেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে বাবু হোসেনের জন্য শ্রুতি লেখকের অনুমোদন নিশ্চিত করা হয়।
ইউএনও ইমরানুজ্জামান বলেন,প্রতিটি শিক্ষার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। কোনো শিক্ষার্থী যেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তার শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখি। বিষয়টি জানার পর দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে বাবু হোসেনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
একই প্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন শ্রুতি লেখক হিসেবে এগিয়ে আসে। এক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণে আরেক শিক্ষার্থীর এই সহমর্মিতা মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষা শেষে বাবু হোসেন বলেন, বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। আজ পরীক্ষায় বসতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। আমার একটাই ইচ্ছা পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি করা, যাতে পরিবারের কষ্ট দূর করতে পারি।
শ্রুতি লেখক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাবু ভাইয়ের সমস্যার কথা জানার পর মনে হয়েছে, তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমার লেখার মাধ্যমে যদি তার স্বপ্ন পূরণে সামান্য ভূমিকা রাখতে পারি, সেটাই আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।
প্রতিবন্ধকতা কখনোই মানুষের অগ্রযাত্রার অন্তরায় হতে পারে না,তার উজ্জ্বল উদাহরণ বাবু হোসেন। আর ডিমলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমরানুজ্জামান এর মানবিক উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহমর্মিতার সমন্বয়েই গড়ে ওঠে এমন অনুপ্রেরণামূলক গল্প, যা সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।