পীরগাছার দেউতি হাট ইজারা ঘিরে অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ: ইউএনও স্ট্যান্ড রিলিজ

2026-05-02 16:03:53

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দেউতি হাট ইজারা ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর অবশেষে ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। গত বুধবার (২২ এপ্রিল) দৈনিক আমাদের প্রতিদিন পত্রিকায় "দেউতি হাট ইজারা ঘিরে হরিলুট" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাককে বদলি বা স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রংপুর জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে দেবাশীষ বসাককে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলায় বদলি করা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, নতুন কর্মস্থলে যোগদানের উদ্দেশ্যে তাকে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বিকেলেই বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত (রিলিজ) করা হয়েছে। পীরগাছার সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারেক হাসান তাহসিনকে সাময়িকভাবে দায়িত্বভার অর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তাকে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও সেখানে যোগদানের নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না। তবে দুর্নীতির সংবাদটি জনসমক্ষে আসার পর বৃহস্পতিবারের নতুন আদেশে তাকে দ্রুত অবমুক্ত করা হয়। পীরগাছার নতুন ইউএনও হিসেবে নীলফামারীর জলঢাকার ইউএনও জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিনকে পদায়ন করা হয়েছে।

দুর্নীতির খতিয়ান ও অভিযোগের উৎস

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৯ এপ্রিল পীরগাছা ইউএনও কার্যালয়ে খাস ডাকের মাধ্যমে দেউতি হাট ইজারা দেওয়া হয়। ২০ জন বিডারের উপস্থিতিতে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমের মধ্যস্থতায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকায় হাটটি পান পারুল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন।

ইজারা পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়া একটি হিসাব বিবরণী থেকে দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। সেখানে দাবি করা হয়, ইউএনও দেবাশীষ বসাক- ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। উপজেলা বিএনপি সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা- ২ লাখ টাকা তহশিলদার- ২০ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচসহ সর্বমোট ৬ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ টাকা 'ঘুষ' বা অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়।

গত ১৪৩২ বাংলা সনেও দেউতি হাট নিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। সে সময় প্রায় ৫৯ লাখ টাকার টেন্ডার বাতিল করে মাত্র ২৫ লাখ টাকায় খাস ডাক নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ইউএনও নাজমুল হক সুমনসহ একটি চক্র প্রায় ৩৬ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ করেছিলেন।

এছাড়া সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে হাটটি পুনরায় সাব-ইজারা দেওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। বর্তমান সাব-ইজারাদার বেলাল হোসেন জানান, খাস ডাকের প্রকৃত মূল্য ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা হলেও তা বাড়িয়ে ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয় এবং তিনি শেষ পর্যন্ত ৪৫ লাখ টাকায় হাটটি সাব-ডাকে গ্রহণ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে ইজারাদার আব্দুল মতিন সোজাসুজি বলেন, "আমি কাকে কত টাকা দিয়েছি, সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।" পীরগাছা উপজেলা যুবদলের আহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম বিষয়টিকে 'দলীয় ব্যাপার' বলে এড়িয়ে যান। উপজেলা বিএনপি সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, বিদায়ী ইউএনও দেবাশীষ বসাক তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। এ প্রসঙ্গে রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন) রোকসানা জানান, হাট-বাজার তদারকির দায়িত্ব ইউএনও-র। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।