দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত, তবু মাসের পর মাস বেতন উত্তোলনের অভিযোগ

2026-05-18 21:14:54
news-picture

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বাগপুর মাছুম আলী প্রামানিক উচ্চ বিদ্যালয়ের বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক রাহেনা খাতুনের বিরুদ্ধে বরখাস্ত অবস্থায়ও মাসের পর মাস বেতন উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত বছরের নভেম্বরে রাহেনা খাতুনকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু বরখাস্ত থাকার পরও তিনি চার মাসের পূর্ণ বেতন এবং দুই মাসের অর্ধেক বেতন উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বরখাস্তকালীন সময়েও নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ সময় তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতেন। আবার বিদ্যালয়ে এলেও দায়িত্ব পালন না করে শুধু হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যেতেন বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করলেন? কার সহায়তায় এবং কোন প্রক্রিয়ায় এ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে—তা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাসুরা পারভীন বলেন, “বেতন সংক্রান্ত সফটওয়্যারের নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ড আমার কাছে ছিল না। একাধিকবার যোগাযোগ করার পরও সেটি পাইনি। বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক প্রথম দিকে ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলেন। পরে চলতি বছরের মে মাসে সঠিক পাসওয়ার্ড পেয়েছি। তিনি কীভাবে টাকা তুলেছেন, তা আমার জানা নেই।”

নতুন পাসওয়ার্ডের জন্য দীর্ঘদিন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবেদন না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি প্রধান শিক্ষকের কাছে বারবার পাসওয়ার্ড চেয়েছি। তিনি আমাকে একটি পাসওয়ার্ড দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি আমার ই-মেইলের সঙ্গে মিল না থাকায় ভুল হিসেবে দেখায়। এর মাঝে প্রধান শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন তিনি অর্ধেক বেতন তুলেছেন। কিন্তু পরে আমি দেখতে পাই তিনি পুরো বেতনই উত্তোলন করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “পাসওয়ার্ড পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হয়—এটা আমার জানা ছিল না। পরে আমি এপ্রিল মাসে আবেদন করি এবং মে মাসে নতুন পাসওয়ার্ড হাতে পাই।”

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. আরিফ মাহফুজ বলেন, “পাসওয়ার্ড পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সম্প্রতি এ বিষয়ে আবেদন করেছেন। তিনি এত দিন আবেদন করেননি কেন, সেটি তার বিষয়। তবে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে।”

সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক রাহেনা খাতুন বিদ্যালয়ে উপস্থিত নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানান, তিনি ছুটিতে আছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাহেনা খাতুনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাহেনা খাতুনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সার্বিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অনিয়মের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যালয়টিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে বলে অভিযোগ তাদের।

এদিকে নতুন করে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ও বরখাস্ত প্রধান শিক্ষিকার মধ্যে ননদ-ভাবির সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি এবং ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।”