বদরগঞ্জে পশুর হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি,বড় গরু নিয়ে বিপাকে বিক্রেতারা

2026-10-24 23:53:11
news-picture

‎বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:

‎পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পশুর হাটে বেড়েছে কোরবানির পশুর সরবরাহ। হাটজুড়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দরদাম আর পশু দেখাদেখিতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও এখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি কেনাবেচা। বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের মধ্যে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, গো-খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ার শঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন খামারি ও প্রান্তিক পশুপালকেরা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলায় সরকারি তালিকাভুক্ত হাট-বাজার রয়েছে মোট ২৪টি। তবে তালিকার বাইরে মোট হাটবাজারের সংখ্যা ৩২টি হাট সক্রিয় রয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রংপুর বিভাগজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক ২০ লাখ ২৩ হাজারেরও বেশি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে বদরগঞ্জ উপজেলায়।

‎সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটে গরু, ছাগল ও ভেড়ার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও অনেকেই এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। অনেকে পশুর দাম যাচাই করছেন, দরদাম করছেন, আবার অনেকে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ফিরে যাচ্ছেন। কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাটে সাঈদ নামে এক বিক্রেতা বলছেন, এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বড় গরুর প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক কম। অধিকাংশ ক্রেতা এক লাখ টাকার মধ্যেই কোরবানির পশু খুঁজছেন। ফলে বড় গরু নিয়ে হাটে আসা অনেক খামারি ও বিক্রেতা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। রফিক নামে আরেক বিক্রেতা জানান, “মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজেট বিবেচনায় এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি দেখা যাচ্ছে। বড় গরু দেখছেন অনেকেই, কিন্তু কিনছেন কম। হাটে পশুর সরবরাহও বেশি হওয়ায় প্রত্যাশিত দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।” মোস্তাফিজার নামে এক খামারির অভিযোগ, পশু পালনে খরচ বেড়ে গেলেও সেই তুলনায় বাজারমূল্য বাড়েনি। গো-খাদ্য, ভুসি, খৈল, খড় ও চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে একটি পশু বড় করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু হাটে এসে সেই অনুপাতে দাম মিলছে না। ইমরান নামে আরেক খামারি জানান, “সারা বছর কষ্ট করে গরু পালন করেছি। খাবারের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। এখন যদি ন্যায্য দাম না পাই, তাহলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে। বড় গরুর বাজার দুর্বল থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।” অন্যদিকে সুরুজ মিয়া নামে এক ক্রেতার ভাষ্য ভিন্ন। তিনি বলছেন, ঈদের এখনও ৫ বাকি রয়েছে। এখনই গরু কিনে বাড়িতে রাখলে খাবার, পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই অনেকেই ঈদের দুই-একদিন আগে পশু কেনার পরিকল্পনা করছেন। একাধিক ক্রেতা বলেন, “এখন গরু কিনলে কয়েকদিন বাড়িতে রেখে দেখাশোনা করতে হয়, যা কষ্টসাধ্য। তাই শেষ মুহূর্তে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার অনেক হাটেই গরুর দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে।”

‎রংপুর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ এই দুই উপজেলা মিলিয়ে কোরবানিযোগ্য পশুর মোট চাহিদা প্রায় ৫০ হাজার ৮৬৩টি। সাধারণত বদরগঞ্জ উপজেলায় কোরবানি উপলক্ষে গরু, ছাগল ও ভেড়াসহ প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পশু স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা হয় এবং চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পশু সরবরাহ বজায় থাকে।

‎উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পশুর হাটগুলোতে ইতোমধ্যে কোরবানির পশু বেচাকেনা শুরু হয়েছে। পৌরসভার একমাত্র বড় হাট বদরগঞ্জ হাট পরিচালনা করছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া দামোদরপুর ইউনিয়নের শেখের হাট ও চিলাপাকের হাট, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের লালবাড়ী কালীগঞ্জ হাট, কচুবাড়ী হাট ও শীবের বাজার হাট, গোপালপুর ইউনিয়নের শ্যামপুর হাট, গোপালপুর হাট ও ময়নাকুঁড়ি হাট, রাধানগর ইউনিয়নের পাঠানের হাট, লালদীঘি হাট, মাদারগঞ্জ হাট ও ধোলাইঘাট হাটসহ বিভিন্ন হাটে জমে উঠছে কোরবানির পশুর বাজার। এছাড়াও গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বুড়িরপুকুর হাট, বালাডাঙ্গা হাট, বোর্ড হাট ও শালবাড়ী হাট, মধুপুর ইউনিয়নের উত্তর বাওচন্ডি হাট ও দাড়ার হাট, লোহানীপাড়া ইউনিয়নের কাঁচাবাড়ী হাট, মণ্ডলের হাট, মাঠের হাট ও পানারহাট, কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগের হাট, রজবোল্লার হাট ও নাটারাম হাট এবং কালুপাড়া ইউনিয়নের বৈরামপুর হাট, ঢুকঢুকির হাট ও লালদিঘি হাটেও কোরবানির পশু কেনাবেচা চলছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে উপজেলা পরিষদ কতৃপক্ষ। কোরবানির পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। হাটগুলোতে জাল নোট শনাক্তে ব্যাংকের প্রতিনিধি, পুলিশের টিম এবং নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রোগমুক্ত অবস্থা নিশ্চিত করতে নিয়মিত কাজ করছে।

‎এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, “কোরবানির পশুর হাটগুলোতে সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে কেনাবেচা করতে পারেন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম, হয়রানি বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বদরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. স্বপন চন্দ্র সরকার বলেন, “কোরবানির পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে। সুস্থ ও নিরাপদ পশু নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। খামারিদেরও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাজারে মানসম্পন্ন ও রোগমুক্ত পশু সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।” বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন,“কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জাল নোট, চুরি, ছিনতাই কিংবা কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে হাট এলাকায় পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।” ঈদের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। শেষ সময়ে ক্রেতাদের ভিড় বাড়লে পশুর হাটে কেনাবেচার গতি বাড়বে বলে আশা করছেন বিক্রেতা ও খামারিরা। তবে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য দাম না পেলে ভবিষ্যতে অনেক খামারি পশুপালনে আগ্রহ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।