কুড়িগ্রামের চরে কোরবানির স্বপ্ন বিলাসিতা, অনেক ঘরে জুটবে না এক টুকরো মাংসও

2026-05-28 16:39:59
news-picture

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে ঈদের আনন্দ এখন শুধু স্বপ্ন। নদীভাঙনে নিঃস্ব লাখো পরিবারে কোরবানির পশু তো দূরের কথা, অনেক ঘরে এক কেজি মাংসও জুটবে না। অভাব, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঈদ পার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চরবাসীরা।বছরের পর বছর নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলোর কাছে ঈদ এখন যেন বিলাসিতা। সরকারি সহায়তা বলতে ঈদের আগে ১০ কেজি ভিজিএফের চাল আর স্বল্পমূল্যের টিসিবির পণ্য- এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ তাদের উৎসব।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুলেফেঁপে ওটা ব্রহ্মপুত্র নদ কতটা উত্তাল না দেখলে বোঝার উপায় নেই। সেই ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা একটি চরের নাম ‘মাঝের চর’। মাঝের চরের মানুষের নেই সড়ক পথের কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই চর থেকে যাত্রাপুর নৌকা ঘাটে আসতে সময় লাগে ১ ঘন্টা। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরে নদীভাঙনের শিকার অন্তত ৭০টি পরিবার নতুন করে বসতি গড়েছে। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও থামেনি জীবনের সংগ্রাম।

এই চরে আড়াই বছর ধরে বসবাস করছেন আরমান আলী ও আউলিয়া বেগম নামের এক দম্পতি। চার সন্তানের সংসার চালাতে আরমান আলী বাইরের জেলার একটি তাঁত কারখানায় কাজ করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কাজ অনিয়মিত থাকার কারণে এবার ঠিকমতো আয় করতে পারেননি তিনি। তাই ঈদে সন্তানদের নতুন জামা তো দূরের কথা, এক কেজি মাংস কিনে খাওয়ানোর সামর্থও নেই তার।

আরমান আলী বলেন, আমি সিরাজগঞ্জে তাঁতের কাজ করি। তাত তো বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। এবার কাজে যাওয়ার পর থেকে বিদ্যুৎ এর সমস্যা। তাই ঠিকমতো কাজ-কমাই হয়নি। গতকাল বাড়িতে আসছি হাতে টাকা নাই। ছেলে মেয়েদের নতুন জামাকাপড়ও কিনতে পারি নাই। এবার হাতে মাংস কেনার টাকাও নাই। যদি সন্তানদের রেজেক থাকে, তাহলে হয়তো ঈদের দিন তারা মাংস খেতে পারবে।

ওই চরের জেসমিন আক্তার বলেন, আমাদের চরে কোরবানি নাই। ঈদের দিন বাচ্চাদের যে একটু মাংস খাওয়া হবে না। ঈদের দিন সন্তানদের মাংস খাওয়াতে পারলে ভালো লাগতো!

মাঝের চরের বাসিন্দা রাজু মিয়া বলেন, আমাদের এলাকাতে কোরবানি নাই। কারণ সবাই গরিব মানুষ। আর যাদের কিছু টাকা পয়সা আছে, তারা হয়তো বাজার থেকে মাংস কিনে খাবে। আর যাদের টাকা নাই, তারা মাংস খেতে পারবে না। কেউ যদি আমাদের চরে গরু কোরবানি করতো, আমরা খুব খুশি হতাম।

মাঝের চরের বেশিরভাগ মানুষের পেশা কৃষিকাজ আর শ্রমজীবী । বন্যার সময় ছাড়া চরের জমিতে ধান, কাউন, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করেই কোনোমতে জীবন চলে তাদের। কিন্তু উৎপাদন খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে সামান্য আয়। সেই আয় দিয়েই চালাতে হয় পুরো বছরের সংসার।

স্থানীয়রা জানান, বসতি গড়ার তিন বছরেও এই চরে কেউ গরু কোরবানি দিতে পারেননি। এর মধ্যে গতবছর একটি সংগঠন এখানে গরুর মাংস বিতরণ করেছেন। এবার যাদের সামর্থ আছে, তারা হয়তো একটি ব্রয়লার মুরগি কিনেই কোরবানির মাংসের স্বাদ খুঁজবেন।

শুধু মাঝের চর নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা, দইখাওয়ার চরসহ ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের অববাহিকার সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ পরিবারের অবস্থাই প্রায় একই। নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতেই কেটে যায় তাদের জীবন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে,  কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদী। এর মধ্যে প্রধান, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের অববাহিকার চরগুলোতে বসবাস করছে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। নদীভাঙন আর দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলে তাদের প্রতিদিনের জীবন।

কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্থবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, এখানে ১৬টি নদ নদী রয়েছে। প্রায় ৪৬৯টি চর রয়েছে। এর মধ্যে ২৬৯টি চরে সাড়ে পাঁচলক্ষ মানুষের বসবাস। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললে চলে। সামনে যে ঈদ আসছে, তাদের মাঝে আমি ঈদের আনন্দ দেখছি না। কারণ ঈদ নিয়ে তাদের কোন চিন্তা নেই। হাতে টাকা নেই বিলাসিতা করবার মতো। নদ-নদীর পানি হুহু করে বাড়ছে। সামনে যে বন্যা আসছে, সেই চিন্তায় তারা ব্যস্ত আছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর অনেক চরে কোরবানি হয় না। তবে আমি বলবো যারা বিত্তবান আছেন, যারা ঈদের আনন্দ উপভোগ করবেন, তারা যদি তাদের আনন্দের সাথে চরের মানুষের পাশে দাঁড়ান, হয়তো অসংখ্য পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।

কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ জানান, ঈদ উপলক্ষে হতদরিদ্র মানুষের জন্য সরকারিভাবে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিসিবির পণ্যও স্বল্পমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে, যাতে চরাঞ্চলের মানুষ কিছুটা হলেও উপকৃত হন। কুড়িগ্রামে তো অসংখ্য চরাঞ্চল রয়েছে। সেখানকার জীবনমান অনেকটা কষ্টের। ঈদ উপলক্ষে সমাজের বিত্তবান লোকজন যদি চরবাসীর পাশে দাঁড়ায় তাহলে হয়তো চরবাসীর কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে পারতো।