ভারতীয় দুই নাগরিককে বাংলাদেশী জন্মসনদ সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে তদন্ত

2026-06-14 01:59:14
news-picture

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহার বিরুদ্ধে ভারতে জন্ম নেওয়া দুই সহোদরকে জন্মসনদ দেওয়ার অভিযোগে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তদন্তকারী দল সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহা তার দায়িত্বকালীন সময়ে ভারতের নাগরিক দুই সহোদরকে অবৈধভাবে জন্মসনদ প্রদান করেন। একই সঙ্গে তাদের মায়ের নামে মৃত্যুসনদ ইস্যু করার অভিযোগও ওঠে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলে তা প্রশাসনের নজরে আসে এবং পরবর্তীতে এ ঘটনায় আমাদের প্রতিদিনসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গত ৭ জুন রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তদন্তসংক্রান্ত চিঠি জারি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১ জুন বদরগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয়ে তদন্ত পরিচালনা করেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খৃষ্টফার হিমেল রিছিল এবং বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আঞ্জুমান সুলতানা। তদন্তকালে অভিযোগকারী প্রদীপ কুমার সাহা এবং অভিযুক্ত সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহার বক্তব্য পৃথকভাবে গ্রহণ করা হয়।

জানা যায়, বদরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদকে ১৯৯৯ সালে পৌরসভা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয় এবং ২০০০ সালে কার্যক্রম শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পৌর প্রশাসক থেকে চারবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন উত্তম কুমার সাহা। তার দায়িত্বকালেই পৌরসভার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয়ভাবে আলোচিত ছিল।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বদরগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হিসেবে দেখিয়ে রাজ কুমার সাহার দুই ছেলে মনোজ কুমার সাহা ওরফে রানা এবং রাজীব কুমার সাহার নামে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পৃথকভাবে জন্মসনদ ইস্যু করা হয়। জন্মনিবন্ধন বই নম্বর-৮ অনুযায়ী মনোজ কুমার সাহার জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১০ নভেম্বর ১৯৮০ এবং রাজীব কুমার সাহার জন্ম তারিখ ২১ ডিসেম্বর ১৯৮৩। এই দুই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাকপুর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং সেখানেই তাদের জন্ম। তাদের ভারতীয় পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য দুদকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব তথ্য থাকা সত্ত্বেও বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাদের বদরগঞ্জ পৌরসভার নাগরিক হিসেবে দেখিয়ে জন্মসনদ প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয়, তাদের মা আরতী রানী সাহার মৃত্যুসনদ নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়, আরতী রানী সাহা ভারতের কলকাতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কিন্তু একই মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ করে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি বদরগঞ্জ পৌরসভা থেকে তার নামে মৃত্যুসনদ ইস্যু করা হয়। অভিযোগকারীর ভাষ্য, সম্পত্তি সংক্রান্ত কার্যক্রম সহজ করতে পরিকল্পিতভাবে এই জালিয়াতি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় রাজ কুমার সাহার ছোট ভাই প্রদীপ কুমার সাহা গত বছরের ১২ নভেম্বর দুদকের রংপুর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

অভিযোগকারী প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সদস্যরা আমাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে পক্ষপাতিত্ব করা হলে আমি উচ্চ পর্যায়ে পুনরায় অভিযোগ করব।’

তিনি আরও বলেন, উত্তম কুমার সাহার মেয়াদকালে পৌরসভায় নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমানে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টাও হতে পারে বলে আমার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহা জানান, আমার দায়িত্বকালীন সময়ে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই ওই দুই ব্যক্তিকে জন্মসনদ প্রদান করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে তদন্তকারী দলের সদস্য ও বদরগঞ্জ পৌর প্রশাসক ইউএনও আঞ্জুমান সুলতানার মোবাইল ফোনে বক্তব্য জানতে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।