চিলমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্র্হ্মপুত্র নদের ভাঙন ঠেকাতে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ডানতীর রক্ষা বাঁধ। অথচ সেই বাঁধ কেটে নদীতীর সংরক্ষণ ব্লক দিয়ে সড়ক নির্মাণ এবং অবাধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে সরকারের শত কোটি টাকার তীররক্ষা প্রকল্প। নতুন করে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। একই সঙ্গে প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা নিয়েও দেখা দিয়েছে সমালোচনা।
সরেজমিন কাঁচকোল থেকে ফকিরের হাট পর্যন্ত ডানতীর রক্ষা বাঁধ ঘুরে দেখা গেছে, অন্তত ৯টি স্থানে বাঁধ কেটে বালুবাহী ডাম্প ট্রাক চলাচলের জন্য সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কালিরকুড়া টি-বাঁধ থেকে ফকিরেরহাট বাঁধমোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশেই ৭টি স্থানে বাঁধ কেঁটে সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এসব সড়ক টেকসই করতে ব্যবহার করা হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের পিচিং ব্লক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব পথ দিয়ে ভেজা বালুভর্তি ডাম্প ট্রাক চলাচল করায় বাঁধের বিভিন্ন অংশ নিচু হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে অন্তত ৩৩টি স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কাঁচকোল থেকে ফকিরেরহাট পর্যন্ত মাত্র দুটি বালু উত্তোলন পয়েন্ট সক্রিয় ছিল। আওয়ামী সরকারের পতনের পর স্থানীয় বিএনপির কতিপয় নেতা-কর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে বালু ব্যবসা চলে যায়। গত দুই বছরে বাঁধ কেটে ও সংরক্ষণ ব্লক অপসারণ করে অন্তত ১৩টি নতুন বালু উত্তোলন পয়েন্ট চালু করা হয়। যদিও জনরোষের মুখে বর্তমানে পয়েন্টগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ময়নার খামার এলাকার আননাত মিয়া বলেন,‘সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেই বাঁধ কেটে বালু পরিবহনের জন্য রাস্তা করা হয়েছে। এতে বাঁধের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত ও ভাঙন বৃদ্ধি পেলে নদীপাড়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।’
রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে বালু উত্তোলনের পয়েন্টগুলো বন্ধ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাঁধ কেটে তৈরি করা রাস্তাগুলো ধসে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বালু ব্যবসায়ীদের অবাধ কার্যক্রমে এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তাদের কারণে নদীপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।’
স্থানীয়দের দাবি, এসব পয়েন্ট থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ ঘনমিটার বালু উত্তোলন করা হতো। তাদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এর প্রভাবে কাঁচকোল থেকে ফকিরেরহাট পর্যন্ত ডানতীর রক্ষা বাঁধে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অন্তত সাতটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়।
সচেতন নাগরিকদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ এবং ১ কিলোমিটার বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে বালুভর্তি ভারী ডাম্প ট্রাক চলাচলে গ্রামীণ সড়কগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুকুল মন্ডল বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ড অবগত থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্রের কোটি টাকার প্রকল্প যেমন হুমকির মুখে পড়েছে, তেমনি নদীভাঙন ও অবকাঠামো ক্ষতির শঙ্কায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন এলাকাবাসী।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বাঁধ কেটে বালু পরিবহনের জন্য নির্মিত অবৈধ সড়কগুলোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এসব সড়ক অপসারণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আশা করছি।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বের্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন,‘বাঁধ কেটে নির্মিত অবৈধ সড়কগুলো অপসারণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধের অংশগুলো মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’