মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবহেলায় ১১ বছরের শিশুর অকাল মৃত্যু!রংপুর সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের

2026-07-08 14:21:24
news-picture

মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি:

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের চরম অবহেলা, গাফিলতি এবং অমানবিক আচরণের কারণে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর অকাল মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। গত ৫ জুলাই দিবাগত রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় মোঃ মোরসালিন নামের ওই শিশুটি। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা আজ মঙ্গলবার (০৭ জুলাই) রংপুর সিভিল সার্জন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে দায়িত্বরত চিকিৎসকসহ চারজনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন- হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ কাওছার, স্যাকমো (SACMO) জনাব নাহিদ, সিনিয়র স্টাফ নার্স মোছাঃ নাজমা খাতুন এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স মোছাঃ রানু বেগম।

লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জুলাই আনুমানিক রাত ০২:০০ ঘটিকায় শিশু মোরসালিনের তীব্র পেটব্যথা শুরু হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার আশায় দ্রুত মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে তাৎক্ষণিক ভর্তি করা হয় (হাসপাতাল রেজিস্টার নং- ২১৮৯৫)।

অভিযোগ রয়েছে, ভর্তির পর থেকে সকাল ০৭:০০ ঘটিকা পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা শিশুটি তীব্র ব্যথায় শয্যাশায়ী অবস্থায় ছটফট করলেও হাসপাতালের ১ নম্বর অভিযুক্ত কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ কাওছার একবারের জন্যও রোগীকে সশরীরে পরীক্ষা করতে আসেননি। তিনি এই সংকটকালীন সময়ে হাসপাতালের ডিউটি রুমেই অবস্থান করছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, শিশুটির অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকলে তার অভিভাবকরা কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স নাজমা খাতুন ও রানু বেগমের নিকট বারবার গিয়ে কান্নাকাটি করেন এবং ডাক্তারকে ডেকে আনার জন্য আকুতি-মিনতি জানান। কিন্তু উক্ত নার্সরা সম্পূর্ণ অমানবিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন। তারা ডাক্তারকে রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থার কোনো তথ্য পর্যন্ত প্রদান করেননি।

নার্সদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে অসহায় স্বজনরা দায়িত্বরত ওয়ার্ডবয়ের সাহায্যে পরবর্তীতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত স্যাকমো (SACMO) জনাব নাহিদকে জানান। তিনিও শিশুটিকে দেখতে যেতে অস্বীকৃতি জানান।

অবশেষে সকাল আনুমানিক ০৭:০০ ঘটিকায় রোগীর মা নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে সরাসরি চিকিৎসকের ডিউটি রুমে গিয়ে ডাঃ কাওছারকে ডেকে আনেন। ডাঃ কাওছার রোগীর শয্যাপাশে এসে পরীক্ষা করার পর জানান যে, শিশুটি ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।

অভিযোগে আরও এক ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। শিশুটির মৃত্যুর পর অভিযুক্তরা যখন বুঝতে পারেন যে তাদের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তখন তারা নিজেদের প্রশাসনিক দায় ও অপরাধ ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। সকাল আনুমানিক ০৭:১৯ ঘটিকায় (অর্থাৎ শিশুটির মৃত্যুর প্রায় এক ঘণ্টা পর) মৃত রোগীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার একটি ‘ভুয়া ছাড়পত্র’ (রেফারেল লেটার) প্রস্তুত করা হয়। এরপর তড়িঘড়ি করে একটি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স চালক আজাদ মিয়া হাসপাতালে পৌঁছে নিশ্চিত করেন যে, তিনি আসার অনেক পূর্বেই শিশুটি মারা গিয়েছিল।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও রোগীর চাচাতো ভাই মনিরুল ইসলাম মনির বলেন: সকালে আমার ভাই এর অবস্থা খারাপ হওয়ার পর আমি বাধ্য হয়ে চিল্লাচিল্লি করি, তারপর যখন ডাক্তার আসে তখন ভাই মারা গেছে।

মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর হোসেন বলেন, শিশুটি ১০ দিন থেকে অসুস্থ ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। রাত ২ টায় আমাদের এখানে ভর্তি করা হয়। সম্ভবত বাচ্চাটির সার্জিক্যাল সমস্যা থাকতে পারে। আমাদের উপজেলা কমপ্লেক্সে কোনো সার্জন নেই। তারপরেও শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় আমি স্বপ্রণোদিত হয়ে জেলা সিভিল সার্জন স্যারকে তদন্তের জন্য আবেদন করেছি। মৃত্যুর পরে শিশুর মরদেহ কেনো রেফার্ড করা হলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তেই বোঝা যাবে।

অভিযোগকারী মেহেদী হাসান মুরাদ জানান, সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে তাদের এই সম্মিলিত অবহেলা ও গাফিলতি স্পষ্টতই পেশাগত অসদাচরণ এবং অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের শামিল। হাসপাতালের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ এবং উক্ত সময়ের ডিউটি রেজিস্টার পর্যালোচনা করলেই এই নির্মম সত্যের প্রমাণ মিলবে।

এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনপূর্বক জড়িতদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।