তিস্তার পানি বেড়ে যাওয়ায় রাজারহাটে ভয়াবহ ভাঙন, ঘর সরাতে গিয়ে নদীভাঙন দেখে বাবার মৃত্যু

2026-07-09 17:33:56
news-picture
“নদী আমাগো বাজানরেও ছাড়লো না”

প্রহলাদ মন্ডল সৈকত,রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি :

“নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল। সেই সঙ্গে আমাগো বাজানরেও ছাড়লো না। দুইটা টিনের ঘর, দুইটা আমগাছ আর একটা কাঁঠাল গাছ কেটে নেওয়ার আগেই নদীতে চলে গ্যাইছে। বাকি ঘর সরানোর সময় নদীর দিকে তাকিয়ে বাজান হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল। এরপর আর একটা কথাও কইলো না। আমাগো বাজান আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।”

কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ গ্রামের বাসিন্দা মিজান (২৫)। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ৭টার দিকে তিস্তা নদীর ভাঙন থেকে বসতঘর সরানোর সময় তাঁর বাবা আব্দুল সালাম (৪৫) ভাঙনের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার(৯জুলাই)  চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। আপাতত তিস্তার পূর্ব তীরে ভাঙন কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও পশ্চিম তীরের চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ এলাকায় চলছে ব্যাপক ভাঙন। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী অব্যাহতভাবে তীর গিলে খাচ্ছে।

নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, গাছপালা ও বিস্তীর্ণ আবাদি জমি। কৃষকদের বাদাম, আমনের বীজতলা, মরিচ, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, পাট ও ভুট্টার ক্ষেত ইতোমধ্যেই নদীতে তলিয়ে গেছে। প্রবল স্রোত ও বাতাসের কারণে কিছুক্ষণ পরপরই নতুন নতুন অংশ নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখা, চর চতুরা, চর রামহরি ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁ, চর গতিয়াসাম এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ও মাঈদুল জানান, গত চার দিনে চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রামের কমপক্ষে ৮টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মমিনুল ইসলাম (৪০), আব্দুল সালাম (৪৫), কাফি (৪০) ও জয়নাল (৬০)-এর বসতবাড়ি সম্পূর্ণ নদীতে চলে গেছে। এছাড়া চর তৈয়বখাঁ গ্রামের ফকরুল ইসলাম (৪৫) ও আব্দুর সাত্তার (৪০)-এর বাড়িও ভাঙনের শিকার হয়েছে।

চর তৈয়বখাঁ গ্রামের ফকরুল ইসলাম বলেন, “এই নিয়ে তিনবার বাড়ি সরাইলাম। এখন আমার আর থাকার মতো কোনো জমিই নাই। কোথায় যামু, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।”

চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মমিনুল ইসলাম বলেন, “মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ভাঙন পূর্বচর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মসজিদের একেবারে কাছে চলে এসেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। এতে শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহর এবাদতের ঘর দু’টিও রক্ষা করতে পারছি না। এছাড়া দুই শতাধিক পরিবার এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।”

বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, “চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার আনন্দবাজার এলাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বুধবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আমার সঙ্গে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।”

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদীতীর রক্ষায় প্রায় ৩০টি পয়েন্টে দুই লাখ জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে চরাঞ্চলে কাজ করার জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকায় সেখানে এখনো কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মোজাহিদ বলেন, “ভাঙনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে (ডিজি) জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।