টাকা না দেওয়ায় ওএমআর বদলে দাখিল পরীক্ষার্থীকে ফেল করানোর অভিযোগ

2026-09-23 23:03:06
news-picture
চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে ওএমআর শিটের সিরিয়াল ও স্বাক্ষরে গরমিল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় টাকার বিনিময়ে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর সরবরাহ এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক দাখিল পরীক্ষার্থীর ওএমআর শিট পরিবর্তন করে তাকে ফেল করানোর অভিযোগে চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিদর্শক মো. মোশারফ হুসেন গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) গঙ্গাচড়া মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলা হওয়ার পর থেকে আসামিরা পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। মামলার আসামিরা হলেন—গঙ্গাচড়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ও দাখিল পরীক্ষা-২০২৬-এর সহকারী কেন্দ্র সচিব মো. আব্দুল বাকী ওরফে লিটন, সাউদপাড়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও হল সুপার মো. রোকনুজ্জামান, গঙ্গাচড়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব মো. অলিউল্লাহ এবং ধনতোলা বাজার দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. ইব্রাহিম খলিল। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় কোলকোন্দ তাকিয়া শরীফ আলিম মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মো. হাবিবুল বাশার মুবিন গঙ্গাচড়া ডিগ্রি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে জীববিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষা দেন। গত ২০ মে বিকেলে পরীক্ষা চলাকালে প্রথম আসামি আব্দুল বাকী ওরফে লিটন টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মুবিন টাকা দিয়ে উত্তর নিতে অস্বীকৃতি জানালে তার সঙ্গে লিটনের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে পরীক্ষা শেষে মুবিনের বহুনির্বাচনী অংশের ওএমআর শিট পরিবর্তন করে অন্য একটি ওএমআর শিট শিক্ষাবোর্ডে পাঠানো হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। গত ১০ আগস্ট দাখিল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মুবিন দেখতে পান, অন্য সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও জীববিজ্ঞান বিষয়ে তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন। পরে ফল পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করেও ফল পরিবর্তন হয়নি। এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তার জীববিজ্ঞান বিষয়ের লিখিত উত্তরপত্র ও বহুনির্বাচনী অংশের ওএমআর শিট পর্যালোচনা করা হলে মুবিন দাবি করেন, দেখানো ওএমআর শিটটি তার নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাবোর্ডের রেজিস্ট্রারের অফিস আদেশে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি পরীক্ষার্থীর আবেদন, লিখিত ও বহুনির্বাচনী পরীক্ষার ওএমআর শিট, হাজিরা শিটসহ সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করেন। এ সময় পরীক্ষার্থীর হাজিরা শিটে থাকা ওএমআর শিটের স্বাক্ষরের সঙ্গে শিক্ষাবোর্ডে জমা দেওয়া ওএমআর শিটের স্বাক্ষরে গরমিল পাওয়া যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি পাওয়া যায়। মুবিনের হাজিরা শিটে থাকা বহুনির্বাচনী ওএমআর শিটের প্রকৃত সিরিয়াল নম্বর ২৫০০৫৮৬০২০ হলেও শিক্ষাবোর্ডে জমা দেওয়া ওএমআর শিটের সিরিয়াল নম্বর ২৫০১৫৭৫১৫৩। এজাহারে আরও বলা হয়, তদন্ত কমিটির কাছে তিন আসামি লিখিত বক্তব্য দিলেও প্রথম আসামি আব্দুল বাকী ওরফে লিটন কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, পরীক্ষা চলাকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে উত্তর সরবরাহের চেষ্টা এবং পরে পরীক্ষার্থীর প্রকৃত ওএমআর শিটের পরিবর্তে অন্য একটি ওএমআর শিট জমা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। মামলার ২ নম্বর আসামি মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘হঠাৎ বোর্ড থেকে ফোন করে জানানো হয়, ওএমআর পরিবর্তন হয়েছে। আমি বলেছি, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এরপর আমাদের বোর্ডে ডাকা হয়। আমরা গিয়ে বিষয়টি দেখি। আমি হল সুপার ছিলাম বলে আমাকে মামলার আসামি করা হয়েছে।’ অন্য তিন আসামির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী হাবিবুল বাশার মুবিন বলেন, ‘জীববিজ্ঞান পরীক্ষা শেষে আমাদের সবাইকে থাকতে বলেন লিটন হুজুর। এরপর আমাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। আমি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে লিটন হুজুর ক্ষুব্ধ হন।’ মুবিন আরও বলেন, ‘ফল প্রকাশের পর দেখি, সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও শুধু জীববিজ্ঞানে ফেল করেছি। পরে বোর্ডে চ্যালেঞ্জ করেও ফল পরিবর্তন হয়নি। এরপর বোর্ডে গিয়ে চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিই। অভিযোগের পর খাতাগুলো বের করে দেখি, আমার ওএমআর শিট পাল্টে দেওয়া হয়েছে।’ জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বোর্ড আমাকে আশ্বস্ত করেছে, আমি সঠিক বিচার পাব এবং ভর্তির বিষয়েও সহযোগিতা করা হবে। আমি চাই, এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাঁদের সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হোক। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিক্ষার্থীর এমন ক্ষতি না হয়।’ মামলার বাদী মো. মোশারফ হুসেন বলেন, ‘বোর্ডের লিখিত আদেশের কারণে থানায় মামলা করেছি। বোর্ডে পাঠানো কাগজপত্র দেখে মনে হয়েছে, শিক্ষার্থীটির সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। তদন্তে যা পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’ মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা গঙ্গাচড়া থানার এসআই মো. মশিউর রহমান জানান, মামলার পর থেকে আসামিরা গা ঢাকা দিয়েছেন। মামলাটি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস ছবুর বলেন, ‘প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা গেলে এ ঘটনার সঙ্গে কারা কারা জড়িত এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।’