নির্মল রায়:
শারদীয় দুর্গাপূজার আর বেশি দিন বাকি নেই। এরই মধ্যে পূজার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন লালমনিরহাটের প্রতিমা কারিগররা। জেলার কালীগঞ্জ ও হাতীবান্ধা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলছে প্রতিমা তৈরির কর্মযজ্ঞ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাটি, খড়, বাঁশ ও রঙের কাজে ব্যস্ত কারিগররা। একদিকে চলছে কাঠামো তৈরির কাজ, অন্যদিকে কেউ দিচ্ছেন মাটির প্রলেপ, আবার কেউ ব্যস্ত প্রতিমার শরীরের নিখুঁত আকৃতি ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে। তৈরি হওয়া এসব প্রতিমা শুধু লালমনিরহাটেই নয়, রংপুর, নীলফামারীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার পূজামণ্ডপে যাবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কালীগঞ্জ উপজেলার দলগ্রাম ইউনিয়নের তেতুলতলা এলাকায় অনন্ত মালীসহ কয়েকজন কারিগর প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত। উঠানের এক পাশে সারি সারি বাঁশ ও খড়, অন্য পাশে মাটির তৈরি অর্ধসমাপ্ত প্রতিমা। কোথাও চলছে কাঠামোর ওপর খড় বাঁধার কাজ, আবার কোথাও দেওয়া হচ্ছে মাটির প্রলেপ। প্রতিমার মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশ নিখুঁতভাবে তৈরি করতে ব্যস্ত কারিগররা।
একই চিত্র দেখা গেছে হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের বোর্ডের হাট এলাকায়। সেখানে শ্রী সুধীর চন্দ্র রায় ও চন্দ্রকান্ত মালীসহ কারিগররা প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এছাড়া কালীগঞ্জ উপজেলার শিয়ালখোওয়াসহ বিভিন্ন এলাকাতেও চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ।
বোর্ডের হাট এলাকার প্রতিমা কারিগর শ্রী সুধীর চন্দ্র রায় বলেন, “এ বছর আমি পাঁচটি প্রতিমার অর্ডার পেয়েছি। প্রতিটি প্রতিমার দাম ৪৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। আমার তৈরি প্রতিমাগুলোর কয়েকটি নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকাসহ বিভিন্ন উপজেলায় যাবে। তবে প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার লাভ কিছুটা কম হবে। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি প্রতিমায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভ হতে পারে।”
একই এলাকার কারিগর চন্দ্রকান্ত মালী বলেন, “এ বছর প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছি। প্রতিমার দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৫৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা সরবরাহ করতে এখন দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে। উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় খরচ অনেক বেড়েছে।”
কালীগঞ্জ উপজেলার দলগ্রাম ইউনিয়নের তেতুলতলা এলাকার কারিগর অনন্ত মালী বলেন, “এ বছর প্রতিমার অর্ডার পেয়েছি। প্রতিটি প্রতিমার দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হচ্ছে। পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় এখন কাজের চাপ অনেক বেশি। সময়মতো প্রতিমা তৈরি করে দিতে দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে।”কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি প্রতিমা তৈরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় প্রতিমার কাঠামো। এরপর খড় দিয়ে দেওয়া হয় শরীরের প্রাথমিক আকৃতি। পরে মাটি দিয়ে একাধিক ধাপে প্রলেপ দেওয়া হয়। মাটি শুকিয়ে গেলে প্রতিমার বিভিন্ন অংশ আরও নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়। এরপর রং, পোশাক, অলংকার ও সাজসজ্জার মাধ্যমে পূর্ণতা পায় প্রতিমা।
কারিগররা জানান, প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত বাঁশ, খড়, মাটি, রং, কাপড়, অলংকারসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচও রয়েছে। ফলে প্রতিমা তৈরিতে ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে লাভ বাড়ছে না।
স্থানীয়রা জানান, লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকার প্রতিমা কারিগরদের তৈরি প্রতিমার চাহিদা জেলার বাইরেও রয়েছে। প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে রংপুর ও নীলফামারীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কারিগরদের কাছে প্রতিমার অর্ডার আসে। অর্ডার অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি করে সেগুলো ট্রাক, পিকআপ বা অন্যান্য যানবাহনে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রতিমা তৈরির এই কর্মযজ্ঞকে ঘিরে কারিগরদের পাশাপাশি বাঁশ, খড়, রং, কাপড় ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহকারীদেরও ব্যস্ততা বেড়েছে। পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কাজের চাপ।
কারিগরদের ভাষ্য, প্রতিমা তৈরির এ পেশা তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বছরের অন্যান্য সময়ে কাজ কম থাকলেও দুর্গাপূজার মৌসুমে ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় অর্ডার বেশি পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরাও তাদের কাজে সহযোগিতা করেন।
লালমনিরহাটের এসব কারিগরের তৈরি প্রতিমা এখন জেলার সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে রংপুর ও নীলফামারীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। মাটির সঙ্গে কারিগরের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে প্রতিমাগুলো। আর পূজার দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ত হয়ে উঠছে লালমনিরহাটের প্রতিমা তৈরির কারিগরদের পাড়া-মহল্লা।