পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতিতে পাখিই রক্ষা করছে রংপুর অঞ্চলের রোপা আমন

2026-11-01 19:22:43
news-picture

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতিতে পাখিই রক্ষা করছে রংপুর অঞ্চলের রোপা আমন ধান। এর ফলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পার্চিং পদ্ধতি। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুরে এবার এক লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় রংপুরের কোন কোন এলাকায় রোপা আমন ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। যা উৎপন্নের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।

মৌসুমের শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে এবার জেলায় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টনের অধিক চাল উদ্বৃত্ত থাকবে বলে তারা আশা করছেন। চলতি বছর ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর রোপা আমন ক্ষেতে পার্চিং করা হয়েছে, যা রোপনের ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লাইফ পার্চিং (ধৈঞ্চা দিয়ে) এবং ১ লাখ ৩১ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে ডেড পার্চিং (গাছের ডাল, বাশের কঞ্চি, বাশের বাতা ইত্যাদি) ব্যবহার করা হয়েছে। রোপা আমন ধানক্ষেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতি এখন রংপুর অঞ্চলের চাষীদের নিকট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে ধানক্ষেতের আইল বা জমির মাঝে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা খুঁটি স্থাপন করে পোকা খেকো পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। এসব পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। রংপুরের বিভিন্ন উপজেলার চাষীরা মূলত দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। ডেড পার্চিংয়ে জমিতে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি বা খুঁটি পুঁতে দেয়া হয়। আর লাইভ পার্চিংয়ে জমিতে ধইঞ্চা বা অন্য কোনো জীবীত গাছ লাগিয়ে পাখির বসার ব্যবস্থা করা হয়। সরেজমিন জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের রোপণ করা আমন ধানের ক্ষেত এখন সবুজে ছেয়ে গেছে। কোথাও ধানে শিষ বের হয়েছে, আবার কোথাও ধান পাকতে শুরু করেছে। দিগন্তজোড়া সবুজ ধানের মাঠের মাঝে দেখা যাচ্ছে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি। এসব পার্চিংয়ের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে। চাষীরা জানান, পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারে একদিকে যেমন কীটনাশকের খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও দূষণমুক্ত থাকছে। একই সাথে পাখির বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক পানি বেয়ে যোগ হয়ে মাটির ও উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করছে।

চাষীরা জানান, পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কম। তাই আমরা কীটনাশকের পরিবর্তে এ পদ্ধতি ব্যবহার করছি। তারা বলেন, এবারে ধানক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করে জমির ধান বেশ সবুজ ও সতেজ হয়েছে। আশা করছি সোনালী ধান ঘরে তুলতে পারব।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পার্চিং পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় চাষীদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অনেক চাষী আমন ধানক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার না করে পোকা দমনে সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব এই পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। কৃষি বিভাগ আরো জানাচ্ছে, আমন ধানের প্রধান ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে রয়েছে মাজরা, পাতা মোড়ানো, চুঙ্গি ও লেদা পোকার মথ পার্চিংয়ের ওপর বসা পাখিরা এসব পোকা ও কীট ধরে খেয়ে ফেলে। ফলে পোকামাকড় ডিম পাড়ার আগেই অনেকাংশে ধ্বংস হয় এবং প্রাকৃতিকভাবেই তাদের বংশবিস্তার কমে যায়। চাষীরা জানান, পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কমেছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমন মৌসুমের শুরুতেই চাষীরা এই প্রাকৃতিক ও লাভজনক পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন। লাইফ পার্চিং জমিতে ব্যাবহার করে পাকা দমনে সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হয়েছে। অনেকেই পুরো ক্ষেতেই পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ফনলও বেশ ভাল হয়েছে। নীচু জমিতে ধৈঞ্চা দিয়ে, গাছের ডাল, বাশের কঞ্চি, বাঁশের বাতা ইত্যাদি পার্চিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব পার্চিংয়ের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল আলম জানান চাষীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলার ৮ উপজেলায় পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কীটনাশক বা বালাইনাশক ক্রয়ের ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি চাষীর রোপা আমনের ফলন ও ভাল হয়েছে। কীটনাশকের খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকছে। পাখীর বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক পানি বেয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করছে। তিনি আশা করছেন এ পদ্ধতিতে চাষীরা লাভবান হবেন।