উত্তাল মার্চপ্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ গাজীপুরে

আমাদের প্রতিদিন
2024-06-13 01:19:13

ঢাকা অফিস:

১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ। গাজীপুরে (জয়দেবপুরে) সংঘটিত হয় প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা এক গৌরবদীপ্ত অধ্যায়। একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকে চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলেও এর আগে ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের মাটিতেই সূচিত হয়েছিল বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীর বাঙালির প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। এ দিনেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর  বিরুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষ থেকে গর্জে উঠেছিল বন্দুক। আর সে কারণেই একাত্তরের মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে সমগ্র বাংলাদেশে স্লোগান উঠেছিল ‘জয়দেবপুরের পথ ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে সমগ্র বাংলাদেশে চলতে থাকে দুর্বার আন্দোলন। এর ঢেউ এসে লাগে জয়দেবপুরেও। আন্দোলন বেগবান করার জন্য জয়দেবপুরে গঠন করা হয় সর্বদলীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ। এ পরিষদের ছিল দুটি শাখা। একটি হাইকমান্ড, অপরটি অ্যাকশন কমিটি। হাইকমান্ডে ছিলেন সাবেক এমপি মরহুম মো. হাবিব উল্লাহ, প্রয়াত ডা. মনীদ্রনাথ গোস্বামী ও মরহুম এম এ মোতালেব।

অ্যাকশন কমিটিতে ছিলেন গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজম্মেল হক (আহ্বায়ক), বিএনপির বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. নজরুল ইসলাম খান (কোষাধ্যক্ষ), মো. নুরুল ইসলাম, মো. আয়েশ উদ্দিন, মরহুম মো. শহীদুল্লাহ বাচ্চু, মো. আবদুস সাত্তার মিয়া, মো. হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া, শহীদুল্লাহ পাঠান জিন্নাহ ও শেখ মো. আবুল হোসাইন।

সে সময় জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ীতে (বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) অবস্থান ছিল দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের। এ রেজিমেন্টের ২৫/৩০ জন ছাড়া সবাই ছিলেন বাঙালি অফিসার ও সৈনিক এবং অধিকাংশই মনে মনে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক।

ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সৈন্যসহ ১৯ মার্চ দুপুরে জয়দেবপুর সেনানিবাসে এসে উপস্থিত হন। কিন্তু বাঙালি সৈন্যদের সতর্ক অবস্থা দেখে তিনি অস্ত্র নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেন।

এদিকে পাঞ্জাব সৈন্যরা অস্ত্র নিতে এসেছে এ খবরটি দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার জনতা লাঠিসেঁাটা, তির—ধনুক বল্লম হাতে জড়ো হতে থাকেন জয়দেবপুরে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় সমরাস্ত্র কারখানা ও মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিক কর্মচারীরাও। জঙ্গি জনতা ইট— পাথর—গাছ দিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। এছাড়া মালগাড়ির একটি ওয়াগন এনে জয়দেবপুর বাজার রেলক্রসিং বন্ধ করে দেয়। জনতার কাতারে কাজী আজিম উদ্দিনসহ সালাম ও সেকান্দর নামে তিনজন বন্দুক নিয়ে উপস্থিত হন। এদিকে ব্যারিকেড দেওয়ার খবর শুনে জাহানজেব ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং সেগুলো অপসারণ করার নির্দেশ দেন। জাহানজেব সামনে বাঙালি সৈন্য ও পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্য দিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হয়ে বাধাপ্রাপ্ত হলে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেন। কিন্তু বাঙালি সৈন্যরা ফাঁকা গুলিবর্ষণ করেন। এ সময় জনতার অনুরোধে কাজী আজিম উদ্দিন আহমেদ, ছালাম ও সেকান্দর পাল্টা গুলি করেন। অপর দিকে টাঙ্গাইল থেকে রেশন পৌঁছে দিয়ে রেজিমেন্টের একটি ৩ টনি ট্রাক জয়দেবপুরে ফিরছিল। এতে হাবিলদার সিদ্দিকুর রহমানসহ পাঁচজন সৈন্য ছিল এবং তাদের সঙ্গে ছিল এসএমজি ও চাইনিজ রাইফেল।

জয়দেবপুর কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে আসামাত্র তাদের গাড়ি থামিয়ে জনতা ঘটনা বর্ণনা করে এবং গুলিবর্ষণের অনুরোধ করে। জনতার মনোভাব বুঝতে পেরে তারা গুলিবর্ষণ শুরু করেন। এটাই ছিল বাঙালিদের পক্ষ থেকে প্রথম প্রতিরোধ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা।