রংপুরে আইআরডিপি প্রতারণা আটককৃত ১০জন জেলহাজতে

আমাদের প্রতিদিন
2024-06-24 13:59:28

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিন বছর ধরে চালাচ্ছে কার্যক্রম

             গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৫৪ ধারায়

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুর নগরীতে আইআরডিপি (ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেফলভমেন্ট প্রোগ্রাম) নামের সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী মোস্তফা কামাল রাসেল প্রতারণার মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তার বিরুদ্ধে বগুড়া জেলার আদমদিঘী থানায় পৃথক একটি সিআর মামলা বিচারাধীন রয়েছে সে মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালত কতৃর্ক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। পুলিশের নথিতে তিনি এখনো পলাতক আসামি। এরপরও রংপুর নগরীতে প্রকাশ্যে অপকর্ম চালিয়ে আসলেও তা পুলিশের নজরে আসেনি। এ নিয়ে আমাদের প্রতিদিনে সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসনের টনক নড়ে। গত সোমবার সন্ধ্যায় তার অফিসে তল্লাশি চালিয়ে ডিবি পুলিশ ১০জনকে আটক করলেও ওই সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান আশেক আলীসহ আটককৃতদের বিরুদ্ধে কোন আমলযোগ্য অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়নি। আটককৃতদের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে মঙ্গলবার আাদালতের মাধ্যমে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাইবান্ধায় নকশী নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করে সেখানে লোকজনকে প্রতারিত করেন তিনি। এ নিয়ে থানায় মামলা দায়ের হলে সে মামলায় আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ২৫ লক্ষ টাকা জরিমানা করেন। একই রকম প্রতারণার মামলায় তার বিরুদ্ধে আদমদিঘী থানায় পৃথক একটি মামলা বগুড়া জেলা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফুলছড়ি থানার ওসি রাজিবুজ্জামান বসুনিয়া।

এর পর গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি ছেড়ে রংপুরে এসে আস্তানা গাড়েন। মাত্র ১০ লাখ পুঁজি ব্যাংকে গচ্ছিত দেখিয়ে তিনি রংপুর বিভাগের ৫৩৫টি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে কমিউনিটি হেল্থ কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন প্রায় সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে। অথচ তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন প্রায় ৩ মাস ধরে পাওনা রয়েছে। ওই নির্মাণ কাজের ব্যয় করছেন বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের সাথে চুক্তিনামা অনুযায়ী ৬শতক জমি ক্রয়সহ দ্বিতল বিশিষ্ট পাকাঘর নির্মাণ ব্যয় প্রতিটির ধরা হয়েছে ৮৪ লাখ টাকা। তিন বছর মেয়াদি ওই নির্মাণকাজ শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করার কথা। এখনো তিনি কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করতে পারেননি।

শুধু তাই নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে রংপুর নগরীতে আইআরডিপি(ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেফলভমেন্ট প্রোগ্রাম) নামে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এমন তথ্য মিলেছে। তাদের কার্যক্রমের সাথে কয়েকজন সংসদ সদস্য ও দলের নেতা যুক্ত আছেন বলে ওই সংস্থার প্রধান নিবার্হী কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল রাসেল এই প্রতিবেদক কে জানিয়েছেন। একটি ছবিতে দেখা গেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি রংপুর সদর উপজেলার  সদ্যপুষ্করনী ইউনিয়নের রামজীবন কমিউনিটি হেলথ কমপ্লেক্সের নির্মাণ উদ্বোধন করছেন রংপুর সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ও আসন্ন রংপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী অ্যাড. ফিরোজ কবীর চৌধুরী গুঞ্জন। প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ কক্ষ বিশিষ্ট উক্ত হেলথ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ করছেন মেসার্স ফারুক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আইআরডিপি’র সভাপতি মোঃ আশেক আলী, আইআরডিপি’র চীফ কো—অর্ডিনেটর মোঃ সাজেদুর রহমান, পরিচালক মোঃ খালেকুজ্জামান আরিফ, মোঃ শফিকুল ইসলাম, প্রবীণ রাজনীতিবিদ আব্দুল জলিল, মেসার্স ফারুক ট্রেডাসের স্বত্বাধিকারী মোঃ ওমর ফারুক, রংপুর সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাজ্জাজুর রহমান, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ব্রজ গোপাল বিশ্বাস, সদস্য কামরুজ্জামান, হরিদেবপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ দেলোয়ার হোসেন দুলাল,রংপুর সদর উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি মামুনুর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক মোন্নাফ আলী লিটু, সাবেক ইউপি সদস্য রুহুল আমীন, ব্র্যাক রংপুরের লানিং ফ্যাসিলেটর মোছাঃ রুহেনা পারভীন, মোছাঃ মরিয়ম খাতুন ও মুক্তি রানী সরকারসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সহ একাধিক ব্যক্তি।

আমাদের প্রতিদিন এর হাতে যে সব নথিপত্র এসেছে তাতে দেখা গেছে, মেসার্স ফারুক ট্রেডার্স রংপুরে ৭৫টি, এসএল কপোর্রেশেন গাইবান্ধায় ৭৩টি, প্রতিমা কনষ্ট্রাকশন ও যোগেশ এন্টার প্রাইজ রংপুরের তারাগঞ্জে ৫টি, জাহাঙ্গির এক্স এস নীলফামারীতে ৩৩টি, মা ট্রেডার্স পীরগঞ্জে ৭টি, স্টার পাথ হোল্ডিং দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে ১১টি খায়রুল কবীর রানা রংপুরের পীরগাছায় ২টি, এসপিডি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান লালমনিরহাট জেলায় ৪০টি কমিউনিটি হেল্থ কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য কার্যাদেশে পেয়ে তারা নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। মোট ২৪৬টির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২শ’ ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোন বিল এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

এ নিয়ে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এ,বি,এম আবু হানিফ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার দপ্তরে কোন তথ্য নেই। বিধি অনুযায়ী স্বাস্থ্য—চিকিৎসা সেবা বা হেল্থ কমপ্লেক্স নির্মাণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে অবশ্যই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ও চুক্তি থাকতে হবে। তা না করে সংস্থাটি কী করে রংপুর বিভাগের মধ্যে এই বিপুল সংখ্যক  উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দ্বিতল বিশিষ্ট হেল্থ কমপ্লেক্স নির্মাণ ও চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম শুরু করেছে তা বোধগম্য নয়। তিনি জানিয়েছেন এটি বেআইনি কার্যক্রম। এ ছাড়া একটি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের নথিপত্রে বাংলাদেশ সরকারের লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আমাদের প্রতিদিন এ প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে এনএসআই(জাতীয় গোয়েন্দ সংস্থা) ও ডিবি পুলিশ সংস্থাটির কার্যালয়ে সোমবার সন্ধ্যায় পূর্বে অভিযান চালায়। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ প্রতারণার সাথে যুক্ত নথিপত্র উদ্ধার ও ১০জনকে আটক করেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত উপ—কমিশনার শাহ নুর আলম পাটওয়ারী।

আটককৃতদের ১০ জনের বিরুদ্ধে কোন আমলযোগ্য অপরাধে মামলা দায়ের না করে কেবলমাত্র ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে কেন প্রেরণ করা হলো এমন প্রশ্ন করা হলে রংপুর মহানগর পুলিশের ডিসি কাজী মুত্তাকি ইবনু মিনান বলেন, এ ঘটনায় মামলা করার জন্য কোন বাদী না পাওয়ায় এই ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে কেউ বাদি হলে তখন ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই প্রসঙ্গে রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল হক প্রমানিক বলেন, আইআরডিপি’র কার্যক্রম জনগনের সাথে প্রতারণামূলক ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মনোগ্রাম ব্যবহার করে সরকারের সাথেও প্রতারণা করেছেন এবং যে সমস্ত নথিপত্র সৃজন করেছেন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল রাসেলসহ তার সহযোগীরা তা আইনের ভাষায় আমলযোগ্য অপরাধ। সে কারণে কোন বাদী পাওয়া না গেলে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে এই ঘটনার বাদী হয়ে মামলা করতে পারতেন কেন করেননি তা বোধগম্য নয়।

সংস্থাটি সম্পর্কে অনুসন্ধানে আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে, নথিপত্রে দেখা যায় ২০০৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক পর্যায়ে গাইবান্ধা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ঢাকা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধনকৃত। সেখানে প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা রয়েছে ‘আদর্শ যুব কর্মসংস্থা’(এ, জে, কে, এস), ঠিকানা লেখা রয়েছে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার, কালিবাড়ী বাজার। তাদের শুধু গাইবান্ধা জেলায় কর্মক্রম পরিচালনার কথা ওই নিবন্ধনে লেখা রয়েছে। এরপর সংস্থাটি নাম পরিবর্তন করে ২০১১ সালে ‘আদর্শ যুব কর্মসংস্থা ফাইন্ডেশন’ জয়েন্ট স্টক কম্পানি এণ্ড ফার্ম কর্তৃক নিবন্ধন করে।উল্লেখ্য ফাউন্ডেশন এর নামে নিবন্ধন নিয়ে কোন লাভজনক কাজ করা যায় না। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন।

 সমাজসেবা আইন ১৯৬১ সালের সেচ্ছাসেবী সমাজক্যল্যাণ সংস্থাসমূহ(নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অনুযাীয় ৪৬ নম্বর অধ্যাদেশের আওয়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তর নিবন্ধন দিয়ে থাকে। সেখানে স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে নিবন্ধকৃত নামের কোন পরিবর্তন ও এলাকার বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে সে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। এর পরও কি করে সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল তা রহস্যজনক।