ব্রহ্মপুত্র শুকিয়ে বালুচর, জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা মানুষ
চিলমারী (কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি:
একসময় যার ঢেউয়ে কেঁপে উঠত জনপদ, সেই ব্রহ্মপুত্র আজ যেন ক্লান্ত, নিস্তব্ধ। নদের বুকজুড়ে এখন ধু ধু বালুচর। যেখানে ছিল স্র্রোতের গর্জন, সেখানে আজ বাতাসে উড়ে বালুর ধুলা। শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকেই নদের অধিকাংশ ক্যানেল বন্ধ হয়ে পড়ায় নৌযান চলাচল প্রায় থমকে গেছে। কোথাও কোথাও পানি থাকলেও ঘুরপথে যেতে হচ্ছে, বাড়ছে সময় ও খরচ দুর্ভোগ যেন পিছু ছাড়ছে না।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে নদীকেন্দ্রিক জীবিকার মানুষের ওপর। যারা একসময় নৌকা চালিয়ে বা মাছ ধরে সংসার চালাতেন, তারা এখন বেকার। অনেকেই বাধ্য হয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন নিজের শেষ সম্বল নৌকা ও জাল। কেউ দাদন ব্যবসায়ী কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছেন, আবার কেউ পেশা বদলে শহরমুখী হচ্ছেন।
চিলমারীর ব্রহ্মপুত্রপাড়ে এখন এক বৈপরীত্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। নদ শুকিয়ে বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ বালুচর, কোথাও পড়ে আছে পরিত্যক্ত নৌকা। কাজের অভাবে অনেক মৎস্যজীবী জাল সারানো বা অলস সময় কাটিয়ে দিন পার করছেন; জীবিকার সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
অন্যদিকে, সেই জেগে ওঠা চরজমিই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে কৃষকদের জন্য। বিস্তীর্ণ এলাকায় ভুট্টা, মরিচসহ নানা শাকসবজি ও ফসলের আবাদ শুরু হয়েছে। তবে সম্ভাবনার এই পথে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতাও। উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে নেই সহজ কোনো পরিবহন ব্যবস্থা; ভরসা একমাত্র ঘোড়ার গাড়ি, তাতেও বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
চিলমারী অষ্টমীর চরের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ‘এ বছর ১ বিঘা জমিতে মরিচসহ পাঁচ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসল করেছি। ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় পণ্য পরিবহনে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে।’এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনও হয়ে উঠেছে কষ্টকর। যোগাযোগের অভাবে অনেককে বিশাল চর পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিতে হচ্ছে।
মাঝিপাড়া এলাকার ফুলেল মাঝির কণ্ঠে হতাশার সুর,‘নদীতে চর জেগে উঠেছে, পানি নেই। মাছও নেই। আয় না থাকায় সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে গেছে।’
একই কথা জানান মৎস্যজীবী রহিম উদ্দিন,‘পানি কমে খালগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। মাছ না থাকায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজ খুঁজছে।’
জেলে আসরাফুল বলেন, ‘পানি কমলে মাছ ধরা সহজ হয়, কিন্তু আগের মতো বড় মাছ আর পাওয়া যায় না। ছোট মাছ দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে।’
ধলু রাম যোগ করেন, ‘আগে এই সময়ে নদে হাটু পানি থাকত না। এখন অনেক জায়গায় বালুচর। নদ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, মাছের থাকার জায়গাও কমে যাচ্ছে।’
নৌ-শ্রমিকদের অবস্থাও একই রকম। মো. মঞ্জু মিয়া নামে একজন নৌ-শ্রমিক বলেন, ‘আগে নৌকায় মানুষ আর মালামাল পরিবহন করেই সংসার চলত। এখন কাজ নেই, পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
রমনা নৌকাঘাট মাষ্টার মো. সিদ্দিকুল ইসলাম সিদ্দিক বলেন,‘নদের পানি দ্রুত কমে যাওয়ায় নৌকা চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সময়মতো ড্রেজিং করে নৌপথ সচল না করলে ভবিষ্যতে নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় ১৪’শ ৫২ জন মৎস্যজীবী রয়েছেন, যারা সরাসরি নদীর ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাদের জীবিকায় বড় প্রভাব পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান খান বলেন, ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ মৌসুমে জেলেদের জন্য কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও বছরের অন্যান্য সংকটময় সময়ে তাদের জন্য তেমন কোনো সহায়তা বা বিকল্প আয়বর্ধক কর্মসূচি নেই। বিষয়টি একাধিকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’