বদরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতে গ্রাহকের সংযোগ কেটে চলছে বাণিজ্য, টাকা ছাড়া মিলছে না পুনঃসংযোগ
বদরগঞ্জ ( রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের বদরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের চেংমারি সাব-স্টেশনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সাব-স্টেশনের ইনচার্জ এরশাদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ কিংবা বিধিবদ্ধ নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছেন। পরে দালাল চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে পুনরায় সংযোগ দিচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, ইনচার্জকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে গ্রাহকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে। পরে গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে রসিদ ছাড়াই পুনঃসংযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ চরম হয়রানি ও আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে মধুপুর ও দামোদরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং একাধিক ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এলাকাবাসী জানান, গত কয়েক মাসে শতাধিক গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের কাছে কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বকেয়া বিল না থাকলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজারামপুর এলাকার সুকানপুকুর গ্রামের বাসিন্দা ওসমান গনি বলেন, অনেক আগেই নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করেই চেংমারি সাব-স্টেশনের ইনচার্জ এরশাদুল হক ও স্থানীয় দালাল হিসেবে পরিচিত ওয়ায়েজ কুরুনী তার বাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং মিটার খুলে নিয়ে যান। পরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে তার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার পর স্থানীয় এক ইলেকট্রিশিয়ানের মাধ্যমে মিটার ফেরত দিয়ে পুনরায় সংযোগ চালু করা হয়। মধুপুর ইউনিয়নের পাকারমাথা বাজারের ব্যবসায়ী মনিকৃষ্ণ অভিযোগ করে বলেন, দুই মাসের বকেয়া বিলের কথা বলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে তাকে চেংমারি সাব-স্টেশনে যেতে বলা হয়। সেখানে গেলে বকেয়া বিল, জরিমানা এবং ডিস কানেক্ট (ডিসি) ও রি-কানেক্ট (আরসি) ফি বাবদ রসিদ ছাড়াই চার হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার কিছু সময় পর রিয়াজুল নামে এক লাইনম্যান এসে পুনরায় সংযোগ চালু করে দেন। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রাজারামপুর এলাকার সেচ গ্রাহক রেজাউল করিম। তিনি বলেন, তার সেচ মিটার খুলে নেওয়ার পর কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চেংমারি সাব-স্টেশন ঘেরাও করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সংশ্লিষ্টরা দ্রুত তার মিটার ফেরত দেন এবং পুনরায় সংযোগ চালু করেন। দামোদরপুর ইউনিয়নের শেখেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী সাইদার রহমান জানান, ইনচার্জ এরশাদুল হকসহ কয়েকজন লোক তার দোকানে এসে কথাবার্তার একপর্যায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং মিটার খুলে নিয়ে যান। পরে তিনি যোগাযোগ করলে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা দেওয়ার শর্তে মিটার ফেরত ও পুনঃসংযোগ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা পুনঃসংযোগ নয়, নতুন সংযোগ দিতেও ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে। নির্ধারিত নিয়ম উপেক্ষা করে টাকার বিনিময়ে দূরবর্তী স্থানে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। দামোদরপুর ইউনিয়নের বকশিপাড়ার বাসিন্দা স্বপন মিয়া অভিযোগ করেন, ইলেকট্রিশিয়ান সহকারী এমদাদুলের মাধ্যমে আড়াই হাজার টাকা নিয়ে তাকে খুঁটি থেকে প্রায় ১৬০ ফুট দূরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে চেংমারীর এনামুল হক ও সন্তোষপুর এলাকার আফানের পাড়ার আনিছুল হকের কাছ থেকেও আড়াই হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, ইনচার্জ এরশাদুল হকের নেতৃত্বে স্থানীয় ইলিয়াছসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এই চক্রের সদস্যরা নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে গ্রাহকদের খুঁজে বের করেন। পরে নানা অজুহাতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অর্থ আদায় করা হয়। স্থানীয়দের অনেকে জানান, গ্রাহকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চলে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ শুরু করার খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে কিছু গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তারাগঞ্জের হাড়িয়ারকুঠি এলাকার নজরুল ইসলামের কাছ থেকে নেওয়া চার হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া সন্তোষপুর ভাঙনের পাড়ার বারেক আলী ও সাহেব আলীর কাছ থেকেও নেওয়া পাঁচ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে লাইনম্যান রিয়াজুলের বক্তব্য আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৭ বছর ধরে সাংবাদিকেরা তো চুপচাপ ছিলেন। এখন এসব নিয়ে কেন এত আগ্রহ দেখাচ্ছেন আমরা তা বুঝি। তাই আপনারা যা পারেন লেখেন, সমস্যা নেই। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চেংমারি সাব-স্টেশন ইনচার্জ এরশাদুল হক। তিনি বলেন, আমি যা করেছি নিয়ম মেনেই করেছি। কখনোই নিয়মের বাইরে কোনো কাজ করিনি। তবে অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি। অন্যদিকে বদরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএম বিপ্লব কুমার পাল বলেন, এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেনি। গ্রাহকেরা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, পল্লী বিদ্যুতের নামে চলা অনিয়ম, দালালচক্র ও অবৈধ অর্থ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।