১১ বৈশাখ, ১৪৩১ - ২৪ এপ্রিল, ২০২৪ - 24 April, 2024
amader protidin

চিকিৎসকদের ওপর আস্থাসংকট তৈরি হচ্ছে

আমাদের প্রতিদিন
1 month ago
63


চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ বাড়ছে

আমাদের ডেস্ক:

ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসকের অবহেলাজনিত কারণে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানীতে গত কয়েক মাসে সুন্নতে খতনা ও সিজার করাতে গিয়ে কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। ফাটল ধরেছে রোগী—চিকিৎসকের মধ্যকার সম্পর্কের। রোগীরা আস্থা হারাচ্ছে চিকিৎসকদের ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে রোগী। এতে দেশেরও বদনাম হচ্ছে। এমন ঘটতে থাকলে চিকিৎসার জন্য মানুষ বিদেশমুখী হবে। এসব ঘটনায় অভিজ্ঞ টিম দিয়ে কমিটি করে তদন্ত করে দেখতে হবে।

গত ৮ জানুয়ারি রাজধানীর সাতারকুল বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে মারা গেছে শিশু আয়ান। আয়ানের পরিবার ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সুন্নতে খতনা করানোর জন্য পাঁচ বছরের শিশু আয়ানকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার অভিভাবকরা। সেখানে অনুমতি ছাড়াই আয়ানকে ফুল এ্যানেস্থেসিয়া (জেনারেল) দিয়ে সুন্নতে খতনা করান চিকিৎসকরা। খতনা শেষ হওয়ার পর আয়ানের জ্ঞান না ফেরায় তাকে সেখান থেকে পাঠানো হয় গুলশান—২ এর ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেখানে পিআইসিইউতে (শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) লাইভ সাপোর্টে রাখা হয়। এর আটদিন পর ৮ জানুয়ারি রাতে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মালিবাগের জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে মারা গেছে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আহনাফ তাহমিন আয়হাম (১০)। স্বজনদের অভিযোগ, লোকাল এ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার কথা থাকলেও তারা ফুল এ্যানেস্থেসিয়া দিয়েছে। যে কারণে আহনাফের আর জ্ঞান ফেরেনি। আহনাফের বাবা ফখরুল আলম বলেন, আমরা চিকিৎসককে বলেছিলাম যেন ফুল এ্যানেস্থেসিয়া না দেওয়া হয়। তারপরও আমার ছেলের শরীরে সেটি পুশ করেন ডাক্তার মুক্তাদির। আমি বারবার তাদের পায়ে ধরেছি। আমার ছেলেকে যেন ফুল এ্যানেস্থেসিয়া না দেওয়া হয়। আমার সন্তানকে এ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই মৃত্যুর দায় মুক্তাদিরসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবারই। আমি তাদের কঠোর শাস্তি চাই। এ ঘটনায় দুই চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া সেন্টারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার ১৯ মার্চ দুপুরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় বসুন্ধরা আদ—দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের জন্য শিশু তাসনিয়া (১২) ওটিতে হেঁটে ঢুকলেও বের হয়েছে লাশ হয়ে। তাসনিয়া সোনারগাঁও উদয়ন আদর্শ বিদ্যানিকেতন স্কুলের ছাত্রী। এ ঘটনায় ‘ভুল চিকিৎসায় শিশুটিকে হত্যা’র অভিযোগে মামলা করেছে তার পরিবার।

মামলার পর হাসপাতালের চার চিকিৎসক ও ম্যানেজারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বুধবার (২০ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মাহাবুব আলম।

এছাড়া রাজধানীর কল্যাণপুর ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সিজার করাতে এসে মারা গেছেন পলি সাহা (২৬) নামে এক প্রসূতি। স্বজনদের দাবি, চিকিৎসকের অবহেলায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পলি সাহার মৃত্যু হয়েছে।

জানা যায়, সোমবার দুপুরে স্ত্রী পলিকে প্রসবজনিত সিজার করাতে ইবনে সিনা হাসপাতালে আসেন স্বামী আশীষ রায় মুন্না। সিজারের মাধ্যমে পলি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান পলি।

ইমেরিটাস অধ্যাপক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকেছে। আমাদের (চিকিৎসকদের) প্রতি আস্থাও কমছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার পেছনে অনেকগুলো কারণ জড়িত। তবে ঘটনাগুলো অনাকাঙি্ক্ষত। এমনিতে আমাদের দেশের এতে বদনাম হয়, চিকিৎসকের ওপর থেকে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। যদি এমন ঘটনা ঘটতেই থাকে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? মানুষেরও তো বিপদ।’

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘চিকিৎসায় ভুল আসলেই হচ্ছে কি না এটা শিউর হতে হবে। এ জন্য অভিজ্ঞ টিম দিয়ে কমিটি করে তারা দেখুক যে ইচ্ছাকৃত ভুল নাকি অনিচ্ছাকৃত ভুল। আর কাজটা তো টিমওয়ার্ক। এখানে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ অনেক লোক থাকে। দেখতে হবে তাদের মধ্যে কার কোন জায়গায় ভুল হচ্ছে। এটা শনাক্ত করা দরকার। মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চয় হয়ে গেছে। যেখানে যেখানে মারা গেছে রোগী ওইসব জায়গায় তদন্ত করা দরকার।’

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত এই চিকিৎসক বলেন, ‘মানুষ তো ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করতেই পারে। তা তদন্ত করা দরকার। এই সমস্ত ঘটনা চলতে দেওয়া যাবে না। তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি থাকলে, এটারও দেখা দরকার। সবার ঢালাও দোষ দিচ্ছে। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের অনেকগুলোর শিক্ষক নেই, ইকুইপমেন্ট নেই, প্রশিক্ষণ ভালো হচ্ছে না। ভালো চিকিৎসক তৈরি না হলে ভালো চিকিৎসা কোথা থেকে পাবে। সে দায়িত্ব তো প্রশাসনের। না হলে তো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘দেশে রোগী বেশি। কিন্তু সে অনুযায়ী আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এতো নেই। এতে সুযোগ—সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না। জেলা, বিভাগীয় শহরে সযোগ—সুবিধা থাকলেও গ্রামে তো নেই। যার জন্য যাদের পয়সা আছে তারা বিদেশ চলে যাচ্ছে। এমনকি গ্রাম থেকে ঢাকায় আসলেও তো হয়রানি কম না। দেশে রোগী বেশি হয়ে গেছে। আবার সবাই যে আস্থা হারানোর জন্য যায় তা কিন্তু না।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নতুন ভিসি অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এভাবে বলা মুশকিল যে ভুল চিকিৎসা হয়েছে কি না। তদন্ত না করা পর্যন্ত তো ভুল চিকিৎসা বলা যাবে না। তবে কোনো চিকিৎসকই চায় না তার রোগীর ক্ষতি হোক। আমরা চেষ্টা করি সর্বোচ্চ যাতে রোগী ভালো হয়।’

ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক বলেন, ‘মেডিকেল ইথিকসে রোগী যেটা প্রাপ্য সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যতদূর পারা যায় রোগী যাতে সেইফ থাকে, সেদিকে সচেষ্ট থাকতে হবে। রোগীর সেফটির জন্য যা যা করা দরকার, এখানে কে¤প্রামাইজ করা ঠিক হবে না।’

তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেখতে হবে যে এমন হওয়ার কারণ কী? অবহেলা নাকি দক্ষতার অভাব বা প্রশিক্ষণের অভাব আছে কি না। এটা মন্ত্রণালয়কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে এমন কেন হলো। প্রত্যেকটা ঘটনারই তদন্ত হওয়া দরকার।’

ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগের বিষয় কী করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর— এমন প্রশ্নের উত্তরে অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. মো. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা প্রতিটা ক্ষেত্রেই তদন্ত করছি। অভিযোগগুলোর ব্যাপারে আমরা যথাযথ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে তদন্ত করছি। আর রবিবার ইবনে সিনার ঘটনায় তদন্ত কমিটি করে ফেলব। কেরানীগঞ্জের ঘটনায় এদিন তদন্ত কমিটি করা হবে। এছাড়া হাসপাতালগুলোর প্রতি আমাদের ১০ দফা নির্দেশনা দেওয়া আছে। যদি আরও প্রয়োজন হয় আমরা তা অচিরেই দিব।’

সর্বশেষ

জনপ্রিয়