১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ - ২৫ মে, ২০২৪ - 25 May, 2024
amader protidin

অন্তরায় আস্থা ও নিরাপত্তা সংকটে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা!

আমাদের প্রতিদিন
1 month ago
125


আমাদের ডেস্ক:

সহনীয় খরচে সব শ্রেণি—পেশার মানুষের জন্য গুণগত মানের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনই বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভীষ্ট, ২০৩০ সালের মধ্যে যা অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ বাংলাদেশ। এর মধ্যে কিছু সূচকে সফলতার কথাও বলা হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে। তবে মানুষের আস্থার সংকট ও সেবা সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগের মধ্যে বর্তমান বাস্তবতায় তা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকেও অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্তির সূচক প্রকাশ করে থাকে লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘ইকোনমিস্ট ইমপ্যাক্ট।’ একটি দেশের কাছে জনস্বাস্থ্য কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্রের সব নীতিতে স্বাস্থ্য কতটুকু স্থান পায়, আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে কোনো মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে কি না; এই চারটি উপদানের ভিত্তিতে স্কোর করে তারা।

সংস্থাটির ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ছয়টি অঞ্চলের ৪০টি দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। এতে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৩০ দশমিক ৮০। প্রথম অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের স্কোর ৯০ দশমিক ৮০। এরপর রয়েছে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও চীনের স্কোর যথাক্রমে ৫২ দশমিক ৫০ ও ৭০ দশমিক ৩০।

অপরদিকে ২০২১ সালের বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০—এর মধ্যে ৩৫ দশমিক ৫০। এ ক্ষেত্রে ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৫তম। এছাড়া ইউএইচসি সার্ভিস কাভারেজ ইনডেক্সে ১০০—এর মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ৫২, যা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৮০—তে উন্নীত করতে হবে।

সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য ও বাস্তবতা

২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের কথা বলছে সরকার। এ লক্ষ্যে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়ার দাবি দায়িত্বশীলদের। ৬ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের এক আলোচনার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য দেশের প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত চিকিৎসা পেঁৗছে দিতে হবে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি ঠিকভাবে কাজ করে তাহলেই তা সম্ভব। আমি এজন্য আপনাদের যত রকম সুযোগ—সুবিধা প্রয়োজন তার ব্যবস্থা করব। আপনারা আমাকে সেবা দিন, আমি প্রয়োজনীয় সকল কিছুর ব্যবস্থা করব।’

তবে বর্তমান বাস্তবতায় স্বাস্থ্যখাতে বড় কোনো পরিবর্তন না আসলে লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে আস্থা ও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যের লক্ষ্য বাস্তবায়নে অন্যতম অন্তরায়। এছাড়া এখাতে মোট ব্যয়ে ব্যক্তিগত খরচ অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে স্বাস্থ্যে মোট ব্যয়ে ব্যক্তির নিজস্ব অংশ ৬৮.৫ শতাংশ। যা থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। অপরদিকে বর্তমান অবস্থায় চললে ইউএইচসি সার্ভিস কাভারেজ ইনডেক্সে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ এর পরিবর্তে বাংলাদেশের সম্ভাব্য স্কোর হবে ৬১। অর্থাৎ লক্ষ্য বাস্তবায়ন হবে না।

বড় পরিবর্তন জরুরি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের ইউএইচসি সার্ভিস কাভারেজ ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের স্কোর ৫২। এটা যে গতিতে এগোচ্ছে তাতে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৩০ সালে তা ৬১ তে পেঁৗছাতে পারে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের প্রয়োজন ৮০। এই স্কোর করতে পারলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে বলতে পারব। কিন্তু বর্তমান গ্রোথে তা সম্ভব নয়।

আব্দুল হামিদ আরও বলেন, একটি দেশের স্বাস্থ্যের সার্বিক অবস্থা বুঝতে বেশ কয়েকটি ডায়মেনশন বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে একটি সার্ভিস কাভারেজ ইনডেক্স। এর ১৪টি ট্রেসার ইন্ডিকেটর রয়েছে। এর মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু স্বাস্থ্য, টিকাদান, টিবি ও এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ সেনিটেশন, স্বাভাবিক রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মান, তামাকের ব্যবহার, হাসপাতালে শয্যার ঘনত্ব অন্যতম। এসব ইন্ডিকেটর ৭০ থেকে ৮০ এর কাছাকাছি থাকলে ভালো বলা যায়। কিন্তু আমাদের মাত্র তিনটি ইন্ডিকেটর ৭০ এর ওপরে রয়েছে। এগুলো হলো পরিবার পরিকল্পনা (৭৭), টিবি নিয়ন্ত্রণ (৭১) ও টিকাদান কর্মসূচি (৯৮)। আমরা টিকাদানে অনেক ভালো করেছি। কিন্তু বাকি ইন্ডিকেটরগুলোতে আমাদের অবস্থা খারাপ। বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্যে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। এতে আমাদের স্কোর মাত্র ৩৭।

স্বাস্থ্যসেবার মানের তথ্য তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এই অধ্যাপক বলেন, বিশ্বব্যাংকের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার চেয়েও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস—এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ করতে হতো ৬৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ শতাংশে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যয় ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। তবে কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

আস্থার পরিবেশ নিশ্চিতের তাগিদ

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে—নজির আহমেদ বলেন, একটা সময় দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে সেবা নিত। বর্তমানে তা ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আস্থা কমে আসায় কারণে এটি হয়েছে। নানা ভোগান্তি ও প্রতিবন্ধকতার কারণেই এই অনাস্থা। সেবা পাওয়া রোগীর অধিকার এটা সব চিকিৎসক মনে করেন না। এ কারণে অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবায় পিছিয়ে বাংলাদেশ।

স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, এবারের স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিতে, কাজ করি এক সাথে’। এটি যদি যথাযথ প্রতিপালন করা যায়, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া  প্রতিটি মানুষের অধিকার। এটা অনুগ্রহ বা দয়া করার বিষয় না। প্রতিবাদ্য বাস্তবায়নে সরকারি—বেসরকারি সব হাসপাতালকে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা শুধু অর্থ আয় করবেন তা নয়, রোগীদের মানসম্মত ও কল্যাণমূলক সেবাও তাঁদের নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ওষুধ লেখা বন্ধ করতে হবে। তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবার পরিধি বাড়বে। একইসঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সূচকের অন্যতম বিষয় হচ্ছে একটি দেশে জনস্বাস্থ্যকে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে নিচে।  জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাত প্রথম তিনটি বিষয়ের মধ্যে থাকছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত বাজেটের ১৫ শতাংশ। আমাদের হচ্ছে পাঁচ শতাংশ। কখনও কখনও তা আরও নিচে নেমে যায়। রাষ্ট্রের কোনো নীতিতে স্বাস্থ্য স্থান পায় না। বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তাঘাট,  ভবনসহ অবকাঠামো সব কিছুই হচ্ছে স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে। এতে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ভবনের পর ভবন হচ্ছে কিন্তু খেলার মাঠ নেই, পার্ক নেই, ফুটপাত নেই। থাকলেও তা ব্যবহারের উপযোগী নয়। সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতাল সবখানেই স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে জনগণকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এই অধ্যাপক আরও বলেন, সিস্টেমের মধ্যে যদি কোনো সমস্যা থাকে তাহলে তা অবশ্যই বাধা তৈরি করবে। রোগীদের আস্থাহীনতা তার মধ্যে একটি। এটি একদিনে হয়নি। মানুষ যখন অসুস্থ হয়, তখন সে মানসিকভাবে দুর্বল ও অসহায় অবস্থায় থাকে। এই সময় যেভাবে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার কথা তা যদি না দেওয়া হয়, তখন সে অসুখী হবে। মানুষ টাকা খরচ করছে কিন্তু, সে তার কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। সঠিক তথ্য ও জ্ঞানের অভাবে সে ভুল জায়গায় চলে যাচ্ছে এবং ভোগান্তি পোহাচ্ছে। সা¤প্রতিক সময় সিজারিয়ান সেকশনে মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসছে, খতনা করাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এখন আমরা এই সেবাগুলো গ্রহণের ক্ষেত্রে ভয় পাব। এজন্য আমাদের রোগীরা পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সব দায় চিকিৎসকদের তাও সঠিক নয়। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও ওষুধ দেন। রোগী সঠিক মাত্রায় সে ওষুধ পাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ফলে রোগী যদি ভেজাল ওষুধ খেয়ে সুস্থ না হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন চিকিৎসকর আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এই নিরাপত্তার সংকট দূর করতে হবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়