আনন্দ-উৎসবে ডিমলায় বরণ বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩
হাবিবুল হাসান হাবিব, ডিমলা (নীলফামারী):
নীলফামারীর ডিমলায় উৎসবমুখর পরিবেশে বরণ করা হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। পুরোনো সব গ্লানি আর ব্যর্থতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন আশায়, নতুন স্বপ্নে মুখর হয়ে ওঠে গোটা উপজেলা। দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকেই ডিমলা উপজেলার সর্বত্র বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে সকালে বের করা হয় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার একই স্থানে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সামাজিক সংগঠনের সদস্য এবং সর্বস্তরের মানুষ। শোভাযাত্রাটি ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্য আর বাঙালিয়ানার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। অংশগ্রহণকারীরা নানা রঙের পাঞ্জাবি, শাড়ি ও বৈচিত্র্যময় পোশাকে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রাকে করে তোলেন প্রাণবন্ত। শোভাযাত্রায় দেখা যায় মুখোশ, ঘোড়া, হাতি, পাখি, নৌকা ও কৃষিজীবনের নানা প্রতীক। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের হাতে ছিল রঙিন ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও বৈশাখী প্রতীক, আরো ছিল হাডুডু খেলা যা উৎসবে যোগ করে বাড়তি আকর্ষণ। শোভাযাত্রা শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বাংলা নববর্ষের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। এই উৎসব আমাদেরকে নতুন করে একত্রিত করে এবং সকল ভেদাভেদ ভুলে সাম্যের বার্তা দেয়।দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনায় মঞ্চে উঠে আসে নৃত্য, সংগীত, কবিতা আবৃত্তি এবং লোকজ পরিবেশনা। বাউল গান, ভাওয়াইয়া, পালাগানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত দর্শকদের মুগ্ধ করে। শিশুদের পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক গান ও নৃত্য ছিল বিশেষ আকর্ষণ। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে দর্শকদের মাঝে ছিল উচ্ছ্বাস আর প্রাণচাঞ্চল্য।এছাড়াও বৈশাখ উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। মেলায় গ্রামীণ পণ্য, হস্তশিল্প, মাটির তৈরি সামগ্রী, খেলনা, বাঁশ ও বেতের জিনিসপত্র এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের পসরা বসে। পান্তা-ইলিশ, পিঠা, মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু, জিলাপি, বাতাসা সহ নানা রকম খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা মেলায় ঘুরে বেড়াতে এবং খেলনা কিনতে ভিড় জমায়।মেলায় আসা এক দর্শনার্থী বলেন, “বছরের এই দিনটির জন্য আমরা অপেক্ষা করি। পরিবার-পরিজন নিয়ে একসাথে আনন্দ করার সুযোগ হয়। পুরোনো বছরের সব দুঃখ ভুলে নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা পাই। অপর একজন বলেন, এই ধরনের আয়োজন আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। নতুন প্রজন্মকে আমাদের ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করানোর জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে শহরের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকায় নজরদারি রাখেন, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। ফলে উৎসবটি শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্রিত করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দিন শেষে সূর্যাস্তের সাথে সাথে ধীরে ধীরে শেষ হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা, তবে মানুষের মনে রয়ে যায় উৎসবের রেশ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে দিনটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।পুরোনো বছরের সব দুঃখ, কষ্ট আর হতাশা ভুলে নতুন বছর যেন নিয়ে আসে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা এমন প্রত্যাশাই ছিল সবার মুখে মুখে। নীলফামারীর ডিমলায় এভাবেই আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে বরণ করা হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩, যা স্থানীয় মানুষের মনে নতুন উদ্দীপনা আর আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।