১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ - ০২ জুন, ২০২৬ - 02 June, 2026

চেক জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলা বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক কারাগরে

38
2026-06-02 16:48:31

news-picture

নিজস্ব প্রতিবেদক:

শিক্ষকতার আঁড়ালে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রংপুরের বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক শামীম আল মামুনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। চেক ডিজঅনারের একটি মামলায় গত সোমবার (১ জুন) বদরগঞ্জ আমলী আদালত-২ এর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালত ও মামলা সূত্রে জানা যায়, শামীম আল মামুন স্বাস্থ্য শিক্ষাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অসহায় চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই প্রতারণার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। রংপুর জেলা কোর্ট ইন্সপেক্টর আমিনুল ইসলাম তাঁর আটক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

১৬ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, এক বছর আগে বদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বাওচন্ডি এলাকার মো. ফয়সাল হকের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে প্রায় ১৬ লাখ টাকা নেন শামীম আল মামুন এবং এর বিপরীতে ব্যাংকের চেক প্রদান করেন। টাকা নেওয়ার পর থেকেই তিনি গা-ঢাকা দেন। কোনো উপায় না পেয়ে ফয়সাল হক রংপুর আদালতে একটি মামলা (মামলা নম্বর: সিআর ৩৮২/২৫) দায়ের করেন। এর আগে সমুদয় টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে জামিনে ছিলেন মামুন। কিন্তু টাকা পরিশোধ না করেই গত সোমবার আদালতে হাজিরা দিতে গেলে বিজ্ঞ বিচারক তার জামিন বাতিল করে সরাসরি হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ভুক্তভোগী ফয়সাল হক বলেন,‘শামীম আল মামুন একজন ভয়ংকর প্রতারক। শিক্ষকতার আড়ালে তার একটি বিশাল সিন্ডিকেট রয়েছে। আমার মতো অনেকের কাছ থেকেই তিনি চাকরি দেওয়ার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। টাকা ফেরত না পেয়ে বাধ্য হয়ে আদালতের আশ্রয় নিয়েছি। একজন সরকারি কলেজের প্রভাষক হয়েও তিনি চরম দুর্নীতি করেছেন, আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু বদরগঞ্জেই নয়, ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার আবু হাসান নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৭ লাখ এবং মিঠাপুকুর উপজেলার ওয়ারেস মিয়াসহ আরও তিনজনের কাছ থেকে সরকারের বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এই শিক্ষক। চাকরি দিতে ব্যর্থ হলে তিনি সবাইকে ব্যাংকের চেক দিতেন, যা পরবর্তীতে ডিজঅনার হয়। এরকম শতশত মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা।

এছাড়া, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) এর জাল সনদসহ বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শিক্ষকতাতেও জালিয়াতি ও রাজনৈতিক ভোলবদল করে দাপটের সঙ্গে চলেন তিনি। তথ্যমতে, ২০১১ সালের ১৩ জুলাই বদরগঞ্জ সরকারি কলেজে নিয়োগের সময় শামীম আল মামুন এনটিআরসিএ-এর একটি সনদ দাখিল করেন। ২০২০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এনটিআরসিএ’র সহকারী পরিচালক তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রমাণিত হয় যে, তৃতীয় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ভুয়া নাম, রোল ও ঠিকানা ব্যবহার করে জাল সনদে তিনি প্রভাষক পদে চাকরি নিয়েছিলেন। এই জালিয়াতির ঘটনায় ২০২০ সালেই তার বিরুদ্ধে বদরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছাত্রজীবনে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সাথে ভিড়ে যান। বর্তমানে তিনি নিজেকে ‘জিয়া পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে এলাকায় ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।

এ বিষয়ে বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ভূপেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। আদালতের আইনের ওপরে তো কারো হাত নেই। তিনি যদি কোনো অপরাধে জড়িত থাকেন, তবে সেটি তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করব এবং নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

প্রভাষক শামীম আল মামুন গ্রেফতার হওয়ার পর বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল এই চক্রের সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়