সুন্দরগঞ্জে চোখের সামনে তিস্তার পেটে গেল স্কুল, দিশেহারা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা
হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) :
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার গ্রামে তিস্তার তীব্র নদীভাঙনে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয় ভবন হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা।
মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ তীব্র ভাঙন শুরু হলে চোখের সামনেই বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবন, ওয়াশব্লকসহ স্থাপনার একটি অংশ তিস্তার গর্ভে চলে যায়। এ সময় বিদ্যালয়ে আসা শিক্ষার্থীরা অসহায়ের মতো নদীভাঙনের দৃশ্য দেখছিল।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃষ্টি আক্তার, তাহসিন আহম্মেদ, নাহিদ হাসান, তাছলিমা আক্তার ও অবলোকসহ কয়েকজন ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলে, স্কুল ঘর তো নদীত চলি গেল, আমরা এখন কই ক্লাস করব? কতদিন ধরে স্কুল ঘর রক্ষা করার জন্য স্যার বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছেন। পানি সম্পদ মন্ত্রী, ডিসি, ইউএনও এসে ঘুরে গেলেও স্কুলটা রক্ষা হলো না। এখন কত দিনে নতুন স্কুলঘর হবে, তারপর আবার ক্লাস শুরু হবে, আমরা এখন কী করব?
স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ৮ আগস্ট পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার গ্রামের তিস্তা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। সে সময় লালচামার বাজারের পথসভায় তিনি কোনো প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হতে না দেওয়ার এবং স্থায়ীভাবে নদীভাঙন সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আগেই বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল।
তিনি আরও বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে হয়তো বিদ্যালয়টি রক্ষা করা সম্ভব হতো। এখন দ্রুত বিকল্প স্থানে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার ভোরে নদীভাঙনের খবর পেয়ে সহকারী শিক্ষকদের নিয়ে বিদ্যালয়ে ছুটে আসেন। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে টিনশেড ঘরের টিন খোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে একটি ঘর নদীতে চলে যায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে ওয়াশব্লকসহ অপর ঘরটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, খবর পেয়ে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মনসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সহায়তায় বিদ্যালয়ের কিছু আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, সকালে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও শিক্ষা কর্মকর্তা বিষয়টি তাঁকে অবহিত করেছেন। তিনি শিক্ষা কর্মকর্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, লালচামার গ্রামের ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। তবে ওই স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের করার মতো তেমন কিছু নেই। নদীভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ফেলা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা ছাড়া তাদের সীমিত সক্ষমতার মধ্যে আর তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তিস্তার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করতে নদী খনন, ড্রেজিং, নদীশাসন ও গতিপথ নিয়ন্ত্রণের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
এদিকে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত বিকল্প স্থানে পাঠদানের ব্যবস্থা এবং তিস্তার ভাঙন রোধে কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।