২১ ফাল্গুন, ১৪৩০ - ০৪ মার্চ, ২০২৪ - 04 March, 2024
amader protidin

পীরগঞ্জে নদীর তীর সংরক্ষণের কাজ চলমান, মানুষের মনে উৎসাহ

আমাদের প্রতিদিন
9 months ago
51


আজাদুল ইসলাম আজাদ, পীরগঞ্জ রংপুর:  

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার করতোয়া নদীর তীর সংরক্ষণে  ব্লক স্থাপন ব্যবস্থাপনায় নদীর তীরবর্তী মানুষের ‘স্বস্তি’ আশা করছে। দিনাজপুর ও রংপুর জেলাকে আলাদা করেছে এই করতোয়া নদী। একসময় নদী ভাঙ্গন, বন্যায় যে মানুষরা  চোখের জল ফেলত তা আর দেখা যাবেনা। তাদের মুখে মুখে এখন হাসির জোয়ার ।

ভুক্তভোগী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন,  পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী শাসন ব্যবস্থার ফলে আর কেনো লোকজনের বাড়ী ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হবে না। কাজের মান ভালো হলে, এই এলাকার নদীর তীরগুলো বিনোদনের জন্য আর্কষণীয় স্থান হিসেবে পরিনিত হবে।

নদী শাসন বা নদী সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে কথা হয় পীরগঞ্জ উপজেলার টুকুরিয়ার বিছনা গ্রামের একরামুল, বাদল,মিনারুল ইসলামসহ কয়েকজনের সাথে।  তারা আমাদে প্রতিবেদকে জানান, টুকুরিয়া ইউনিয়নের বিছনা, তরফমৌজা,টিয়ার মারি,সুজারকুটি,পার বোয়ালমারী, জয়েন্তিপুরসহ কয়েকটি গ্রাম নদী ভাঙন এলাকায় হিসাবে পরিচিত। জন্মের পর দেখা নদী ভাঙনের ফলে যুদ্ধ করে টিকে আছি ।

তারা আরো জানান, এমনও দিন এসেছে নদীতে বন্যা, নদীর পার ভাঙার ফলে রান্না করা ভাত রেখে দৌড়ে নিরাপদে যেতে হয়েছে। তখন মনে রাজ্যের চিন্তা কখন যে  ঘরগুলো নদীতে বিলিন হয়ে যায়। ইতিমধ্যে, বিছনা গ্রামের ৩ ভাগ বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে । গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং কৃষি আবাদি জমি উজাড় করে নিয়েছে করতোয়া নদী। যেকারনে এই গ্রামের মানুষ এখন ঢাকাসহ পাশের কয়েকটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। এই ইউনিয়নের কয়েকজন নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন।

চতরা এলাকার নদীর তীরবর্তী চকভেকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, নদী ভাংতে ভাংতে স্কুলের কিনারে পৌঁছে গেছে। বন্যার মৌসুমে বিদ্যালয়ের মাঠে পানি  এসে ঢেউ খেলে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের  অধীনে নদী সংরক্ষণ বা নদী শাসন ব্যবস্থাপনার কারণে স্কুলের ছেলে মেয়েরা নিরাপদে স্কুলে আসতে পারবে।এই নদীর তীর সঠিকাভাবে নির্মাণের ফলে চকভেকা গ্রামে নদী ভাঙনের হাত থেকে রেহাই পাবে বলে এই শিক্ষক জানান।

জানাগেছে, ইতিমধ্যে বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে এই গ্রামের শতশত ঘরবাড়ি নদীতে বিলিন হয়ে গেছে।প্রতিবার বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের পর গ্রামের লোকেরা নতুন নতুন করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। 

চতরা ইউনিয়নের কুমারপুর গ্রামের ছিদ্দিক, সাইফুল, জাফর আলী,জেনাব আলীসহ কয়েকজন বলেন, গ্রামের নিম্ন  মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়টির সাথে  মসজিদ আছে। নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন স্কুল ও মসজিদের কিনারে পৌঁছে গেছে ককন যেন এই প্রতিষ্ঠান গুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বন্যার  পর নদী  টেনে নিয়ে যায় আমাদের মূল্যবান সম্পদ। এই নদী আমাদের কে দরিদ্র বানিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে নদীর তীরে ব্লক স্থাপন করার ফলে বাড়িঘর ভাঙনের ভয় নেই।

পার কুয়াতপুর গ্রামের হালি মাই বেগম বলেন, বন্যার সময় নদীর পানির কলকলি শব্দ শুনে রাতে ঘুম হয়না। এমনকি চুলার উপর ভাতের পাতিল রান্না শেষে খাওয়াদাওয়ার সময়ে ঘর ভেঙে পড়ে। আমাদের এ অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়। পানির সাথে সংসারের সকল জিনিসপত্র ভেসে যায়,  সেসময় পেটে খিদা থাকলেও খাওয়ার কোনো রুচি থাকে না।

রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় নদী তীর সংরক্ষণ, খালবিল পূনঃখনন ও জলাবদ্ধতা নিরসন নামের  প্রকল্পের অধীনে একশো  ৬০ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে  ২৭ টি প্যাকেজে মোট ২৭ টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। এরমধ্যে ১৪ টি প্যাকেজে ৫৭৬০ মিটার  করতোয়া নদীর তীর সংরক্ষণ ব্লক স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে ।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিস সূত্রে জানাযায়, ২০২২ অর্থ বছর থেকে ২৭ টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। ২০২৩ সালের জুন মাসের শেষে অধিকাংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করবে।

গত শনিবার করতোয়া নদী এলাকায় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলতি অর্থ বছরের ৩০ জুন নাগাদ বেশিরভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করবে এবং সেইলক্ষ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো  তাদের কাজ  দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ণ করে যাচ্ছে ।

আরো জানা গেছে, আখিরা নদী সুন্দর্য ও ব্লক স্থাপন মূলক ৬ টি প্যাকেজে ১০.৯৬০ মিটার কাজ চলমান রয়েছে এছাড়াও মরা খাল-বিল পুঃখনন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ এরমধ্যে বুড়া মচ্চব ৯.৭১৮ মিটার, কেরি খাল ৮.৫৬৮ মিটার,সাটকে বাটকে ১০.৭১০ মিটার,করতোয়া সুজার কুটি. ৩৪৫ চৈত্রকোল করতোয়া মরা নদী ৬.৭৮৫ মিটার এবং  আখিরা নদীর শরিফের পাড়া,  কালিতায় দুটি রেগুলেটার স্থাপন করার কথা রয়েছে।

আখিরা নদীর সুন্দর্য নিয়ে কথা হয় ধনাশলা গ্রামের বাসিন্দা এন্তাজ আলী মৌলভী সাথে তিনি বলেন, আখিরা নদীর দুই পাশদিয়ে ব্লক স্থাপন করা হলে এলাকাবাসীর জন্য সুবিধা হবে। তাছাড়াও উপজেলার বড় বিলার সুইচ গেইট রয়েছে সেখানে সকাল বিকাল স্থানীয়লোকজন হাটাহাটি করে এবং বড় বিলার ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করতে সুইস গেইটে বসে সময় পার করে। থানা ব্রিজ থেকে বড় বিলা সুইচ গেইট পর্যন্ত আখিরা নদীর সুন্দর্য বাড়লে দর্শনার্থীদের জন্য সুবিধা হবে।

টুকুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মন্ডল জানান, টুকুরিয়া ইউনিয়নের করতোয়া নদী ঘেঁষে বিছনা গ্রাম। এই গ্রামের লোকদের  করতোয়া নদীর সাথে যুদ্ধ করে অতি কষ্টে বসবাস করছে। এখন নদী শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্লক স্থাপনের কাজ  চলছে। কাজগুলো সঠিকভাবে শেষ হলে তারা অতীতের কষ্ট ভুলে গিয়ে নতুন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখবে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড ( পাউবো)র নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি অর্থ বছরের ৩০ জুন নাগাদ অধিকাংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করবে। এছাড়াও কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ করতে দুই এক মাস সময় বেশি লাগতে পারে।

তিনি আরও জানান, নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আমাদের অফিসের লোকজন সবসময়ই  কাজের মান যাচাই ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের খোঁজ খবর রাখছেন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়