১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ - ২৬ মে, ২০২৪ - 26 May, 2024
amader protidin

নদী ভাঙনের কবলে পড়ে অনেক অবস্থা সম্পন্ন কৃষক এখন দিনমজুর

আমাদের প্রতিদিন
8 months ago
239


এই তিস্তার জন্যে আইজ হামরা নিঃস্ব

গঙ্গাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি:

ঔ যে দেখেনচোল উচা বালুখান, ঔখানে হামার প্রায় ৫০ ঘরের (পরিবারের) বাড়ি আছিল। হামার সউগ শ্যাষ করি দেছে এই তিস্তা নদী। এই তিস্তার জন্যে আইজ হামরা নিঃস্ব ।হামার দন বিশের (২৭ শতক ১ দন) মাটি আছিল, পুকুর ভরা মাছ আছিল, আম-কাঠাঁলের গাছ আছিল । একরাইতে সউগগুলা ভাঙ্গি নিয়া গেইছে এই সর্বনাশা তিস্তা। এই তিস্তার কারণে মোক আইজ মাইনষের ভিটার (জমির) এক কানিত থাকা লাগে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলেকোন্দ ইউনিয়নে সংবাদ সংগ্রহে গেলে অশ্রু সিক্ত চোখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন, বিনবিনা চরের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম (৫৫)।

           প্রতিবছর ২০০-৪০০ পরিবার তিস্তার ভাঙনে সর্বহারা হচ্ছে

এসময় তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৪ বার বাড়ি ভাঙছি। এখন এটে কোন রকমে বাড়ি করি আছি।উপজেলার তিস্তা ভাঙ্গন কবলিত কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এ উপজেলায় তিস্তার ভাঙনে কত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে তার সঠিক হিসেব না থাকলেও, প্রতিবছর ২০০-৪০০ পরিবার তিস্তার ভাঙনে সর্বহারা হচ্ছে। নদী ভাঙনের কবলে পড়ে অনেক অবস্থা সম্পন্ন কৃষক এখন দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা হোটেল শ্রমিক। হতদরিদ্রের খাতায় উঠছে তাদের নাম। অনেকে আবার পরিবারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা শহরে।  গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের এক হিসেব মতে, শুধু চলতি বছরেই প্রায় ১৫০ পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। ভিটেমাটি সব হারিয়ে চলে গেছে অন্যত্র । অনেকে আবার ঠাই নিয়েছে বাঁধের ধারে । গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের গান্নারপাড় গ্রামের আব্দুল মজিদ (৬০)   তার আবাদি জমি ছিল সাত একর।  পরিবার নিয়ে বেশ সুখে-শান্তিতে ছিল । এক সময় তার বাড়িতে প্রতিদিনেই কাজ করতো ৪ থেকে ৫ জন দিনমজুর।  তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে সব জমিই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মজিদ এখন পরিবার পরিজন নিয়ে অন্যের জমিতে বাস করছে।

    নদী ভাঙ্গনে নিঃস্ব অনেকে, পরিবারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা শহরে

আব্দুল মজিদ বলেন, আগে আমার যতগুলা জমি ছিল, গোলা ভরা ধান আছিল। প্রতিদিন আমার বাড়িত ৪ থেকে ৫ জন কাজ করতো। তিস্তা আমার এমন পরিনতি করিল এখন আমাক বেলা ওঠা-ডোবা মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবন বাঁচা লাগে।

উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা এলাকার রুহুল আমিন (৬৫) তার জমি ছিল ছয়-সাত একর। জমাজমি, ঘরবাড়ি তিস্তায় বিলীন হয়েছে। বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে লক্ষীটারী ইউনিয়নের বাগেরহাট আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বসবাস করছেন।

একই এলাকার আবুল কাশেম (৬৭) জানান, তাদের প্রায় ১৫ একর জমি ছিলো সবই এখন তিস্তার বুকে। তিনি আরও বলেন, বাবারে কি আর কইম তিস্তায় হামাক শ্যাষ করিছে। মোর এই জীবনে কয়বার বাড়ি ভাঙ্গচুং তার কেনো হিসাব নাই। তোর দাদীক নয়া কইনা বাড়িত আনি। পরেরদিন বাড়ি ভাঙ্গা লাগছে এই তিস্তার কারনে। তিস্তা হামাক লন্ড-ভন্ড না করিলে কি আর এমন থাকনো হয়.?

উপজেলার লক্ষীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ এলাকার মজিদ মিয়া (৫০) বলেন,  আগে আমাদের শংকরদহে প্রায় ৬০০-৭০০ পরিবার বাস করতো। এখন ১৫-২০ টা পরিবার ছাড়া সব নদীত ভাঙ্গি গেইছে। নদী ভাঙ্গনের কারনে এই শংকরদহ গ্রামটি এখন মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। হয়তো কিছু দিনপর নতুন প্রজন্ম আর জানবে না এই লক্ষীটারী ইউনিয়নে শংকরদহ দহ নামে একটি গ্রাম ছিল।

গঙ্গাচড়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর করাল গ্রাসে প্রতি বছর ঘরবাড়ি, আশ্রয়ণকেন্দ্র, বিদ্যালয়, আবাদি জমি ও অন্যান্য স্থাপনা ভাঙছে। থেমে নেই ভাঙন। নদীতে বিলীন হচ্ছে স্বপ্ন। বাড়ছে দুঃখ-কষ্ট, হতাশা। শেষ নেই দুর্ভোগের। বর্ষায় তিস্তার ভয়াল রূপ হলেও শুষ্ক মৌসুমে প্রতি বছর পলি জমতে জমতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদীর বুক। ফলে বর্ষায় সহজে ভরে যায় নদী, ভাঙে একূল-ওকূল আর সেই সাথে ভাঙ্গে মানুষের কপাল।

লক্ষীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী  বলেন, তিস্তার ভাঙনে জমাজমি হারিয়ে প্রতি বছর শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিনবিনা থেকে শংকরদহ পর্যন্ত সাত কিলোমিটার একটি বেড়িবাঁধ খুবই প্রয়োজন। তাহলে হতো আমারা এই তিস্তার ভাঙ্গন থেকে কিছুটা মুক্তি পাব।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আখিনুজ্জামান বলেন, তিস্তার ভাঙন এখন বামতীরে। সেই ভাঙনের স্থায়ী সমাধানের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদনও হয়ে গেছে। একটি কোম্পানিকে ফিজিক্যল স্ট্যাডি করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফিজিকাল স্ট্যাডি হয়ে গেলে তারপর প্রকল্প তৈরি করে পাঠানো হবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়