৪ শ্রাবণ, ১৪৩১ - ১৯ জুলাই, ২০২৪ - 19 July, 2024
amader protidin

উত্তরের সমতল ভূমির টপসয়েল খেয়ে ফেলছে ইটভাটা

আমাদের প্রতিদিন
5 months ago
161


আবাদী জমি কমে হাওর বাওড়ে পরিনতের আশংক্ষা

পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

উত্তরের সমতল আর সমতল থাকছে না। সমতলিরাই লোভে, ক্ষুধা, দারিদ্রতায় এক শ্রেনীর অসাধু মধ্যস্বত্ব ভোগীদের ফাঁদে পড়ে আবাদী জমির 'টপ সয়েল' ভাটা মালিকদের কাছে বেঁচে দিচ্ছে। এতে ভাটা মালিকরা ও মধ্যস্বত্ব ভোগীরা কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও আবাদী জমিগুলো হারাচ্ছে উর্বরা শক্তি, কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ। হাজার হাজার বছর ধরে কাঞ্চন, করতোয়া, পদ্মা—মেঘনা, যমুনার বিধৌত পলি দ্বারা গঠিত বঙ্গের আবাদী সমতল ভূমি। এই ভূমির 'টপ সয়েল' উর্বর ভূমি পুড়ে হচ্ছে ইট ও ছাই। ফলে সমতলের ব্যাপক জনগোষ্ঠী খুব অল্প সময়ের মধ্যে হাওড়—বাওড় এলাকার অধিবাসীতে পরিণত হতে যাচ্ছে। পরিবেশের উপর পড়েছে বিরুপ প্রভাব। আম, কাঠাল, নারিকেল সহ সকল ধরনের ফল ফলাদি ও উচু জমির উৎপাদন একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।

অনুসন্ধান চালিয়ে আশঙ্কাজনকভাবে এ অবস্থা লক্ষ করা গেছে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায়। উপজেলাটি ৫১টি ভাটার সমণ্বয়ে ভাটাভিত্তিক উপজেলায় পরিণত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, সমগ্র এলাকা ঘুরে দেখার সময় একটি ওয়ার্ডেই ৩১টি ভাটার অস্তিত্ব মিলেছে। প্রতিটি ভাটায় ৫/৭ টি করে আবাদী জমির টপ সয়েলের পাহাড়সম স্তূপ লক্ষণীয়।

উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের মধ্যস্বত্বভোগী লালমিয়া, দ্বিজেন্দ্র বাবু, রবিউল ইসলাম মোমিনপুর ইউনিয়নের বাবলুর সাথে কথা হলে জানান, আমরা নিম্ন—মধ্যবিত্ত কৃষকদের জমির 'টপ সয়েল' গুলো বিঘা প্রতি এক লক্ষ টাকায় কিনে নিয়ে মাহেন্দ্র সংলগ্ন প্রতি টলি দেড় হাজার করে টাকায় ভাটায় বিক্রি করছি। এতে কোথাও কোথাও স্কেবেটর দিয়ে ৩০ ফুট থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত গভীর করে মাটি তুলছি আমরা।

মোমিনপুর ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশীলদার) ফয়জুল হকের সাথে কথা হলে জানান, সমগ্র উপজেলায় 'টপ সয়েল' বিক্রির মহোৎসব চলছে। আমরা নিরুপায়, প্রশাসন উদ্যোগ না নিলে আমাদের করার কিছু নাই। ভূমির মালিক সোহাগের সাথে কথা হলে জানান, 'টপ সয়েল' বিক্রি এখন আবাদ করার চেয়েও লাভজনক হয়ে পড়েছে।

একটি সমীক্ষায় দেখা যায় মাটি, লেবার ও পোড়ানো সহ একটি ইটে খরচ পড়ছে আড়াই টাকা থেকে সাড়ে তিন টাকা পর্যন্ত। অথচ ভাটা মালিকরা প্রতি হাজার ইট বিক্রি করছেন, নম্বরভেদে উপরে সাড়ে ১১ হাজার এবং নিম্নে সাড়ে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, ইটভাটাগুলোতে শ্রমিক দলন সহ শ্রম চুরি হচ্ছে, ভীষণভাবে। ভাটা শ্রমিকদের মধ্যে শিশু ও মহিলা শ্রমিকদের সংখ্যাই বেশি, কারণ এ শ্রেনীর শ্রম কিনে ভাটা মালিকরা হচ্ছেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। নারী শ্রমিক প্রতিদিন পারিশ্রমিক পান আড়াইশ, শিশু শ্রমিক দেড়শ এবং পুরুষ শ্রমিক সাড়ে তিনশ টাকা। অধিকাংশ ভাটার মালিক কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর কথা বললেও রাতের বেলা নিধনকৃত বৃক্ষের কাঠ পোড়াচ্ছে।

শরিফা খাতুন নামে এক নারী শ্রমিকের সাথে কথা বললে জানান, কি করবো বাবা, মজুরি কম দিলেও ক্ষুধার তাড়নায় আমরা কাজ করি। কষ্ট হলো, পুরুষদের চেয়ে বেশি কাজ করি আমরা তারপরেও আমাদের চেয়ে তাদের মজুরিই বেশি। এ ব্যাপারে উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে জানা যায়, সুদীর্ঘদিন ধরে পার্বতীপুর উপজেলায় সহকারী কমিশনার ভূমি কর্মকর্তা নেই। হামিদপুর ইউনিয়নের বিজ্ঞ মহলরা জানান, ২১টি ভাটার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন থাকার পরেও কিভাবে ভাটাগুলো চলছে আমাদের বোধগম্য নয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল কুমারের সাথে কথা হলে জানান, সাধ্যমত এসব নিয়ন্ত্রণে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

বিষয়টি নিয়ে দিনাজপুর জেলা পরিবেশ বিভাগের এডি রুনায়েত আমিন রেজার সাথে কথা হলে বলেন, আমরা এসব নিয়ন্ত্রণের যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়