১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ - ২৫ মে, ২০২৪ - 25 May, 2024
amader protidin

নৌকা চলে না, হেঁটে দীর্ঘ পথ

আমাদের প্রতিদিন
1 month ago
55


সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:

১১ বছর আগে পাঁচটি নৌকা ছিল সুন্দরগঞ্জের হরিপুর চরের নৌ—শ্রমিক ছাত্তার মিয়ার। এর আয় দিয়ে চলত সংসার। এখন মাত্র একটি আছে। সেটিও বছরের তিন মাস মূল তিস্তা নদীতে চালাতেন। নদীতে চর জেগে ওঠায় নৌকা চলে না। সে কারণে মাঝিমাল্লারা বেকার হয়ে পড়েছেন। নদীতে পানি না থাকায় চরে পড়ে থাকা নৌকাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খনন করা হলে তিস্তা তার গতিপথ ফিরে পাবে বলে মত ছাত্তারসহ আরও অনেকের।

খনন, শাসন, সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় তিস্তায় নাব্য সংকট আরও প্রকট হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও পলিতে ভরে গেছে। এক সময়ের খরস্রোতা নদীটি এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, নাব্য সংকটে অন্তত ২০টি রুটে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছেন হাজারো নৌ—শ্রমিক ও জেলে। বেলকা চরের জেলে জয়ন্ত দাসের ভাষ্য, নদীতে এখন পানি থাকে না। পলি জমে মাছ ধরার সুযোগ নেই। এক যুগ ধরে জেলেরা মাছ ধরতে পারে না। সে কারণে অনেকে চাষের মাছের ব্যবসা করছেন। অনেকে রিকশা ও ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, শান্তিরাম, কঞ্চিবাড়ি, চণ্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তিস্তা নদী। তবে স্বাধীনতার পর আজও খনন হয়নি। সে কারণে অনেক স্থানে চর পড়েছে। ভরাট হয়ে এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে অনেক জায়গায়। তিস্তা তার গতিপথ পরিবর্তন করে অসংখ্য শাখা নদীতে রূপ নিয়েছে। বছরে মাত্র ছয় মাস মূল নদীতে নৌকা চলাচল করতে পারে। প্রায় পুরো বছরই হেঁটে পার হতে হয় চরের অনকে বাসিন্দার।

উপজেলার পাঁচপীর, বেলকা, মীরগঞ্জ ও তারাপুর খেয়োঘাট থেকে পীরগাছা, কাউনিয়া, উলিপুর, কুড়িগ্রাম, কাশিমবাজার, চিলমারী, রৌমারী, মোল্লার চর, ভূরুঙ্গামারী, দেওয়ানগঞ্জ, কামারজানি, গাইবান্ধা, সাঘাটা, ফুলছড়ি, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, বালাশিঘাটসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ রুটে এক সময় নৌচলাচল করত। তবে নাব্য সংকটে সব রুটে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ হাজারো নৌ—শ্রমিক ও জেলে নৌকা চালিয়ে এবং মাছ ধরে সংসার চালাতেন। তাদের অনেকে বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকে বাপ—দাদার পেশা পরিবর্তন করে ভিন্ন পেশায় গেছেন।

জেলা ও উপজেলা শহর থেকে কাপাসিয়া ইউনিয়নের বাদামের চরের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। নৌচলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন বিভিন্ন যানবাহনে জেলা ও উপজেলা থেকে পণ্য এনে ব্যবসা করা কষ্টকর হয়ে গেছে বলে জানান বাদামের চরের ব্যবসায়ী ফরমান আলী। তাঁর কথায়, ঘোড়ার গাড়ি ও হাঁটা ছাড়া অন্য উপায়ে চরে চলাচলের মাধ্যম নেই। অথচ ১৫ বছর আগেও নৌপথে সহজে পণ্য আনা—নেওয়া করা হতো।

বেলকা চরের কৃষক শিপন মিয়া বলছিলেন, নদীতে পানি না থাকায় হেঁটে চলাচল করতে হয়। চরাঞ্চলে চলাচলের বিকল্প তেমন কোনো মাধ্যম নেই। নাব্য সংকটে এ অবস্থা হয়েছে। তিস্তা নদী আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে বলে জানান তারাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, পলি জমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে অসংখ্য শাখা নদীতে রূপ নিয়েছে। উপজেলা থেকে অন্তত ২০ রুটে নৌচলাচল বন্ধ আছে। নদী খনন ও ড্রেজিং করা এখন সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে ইউএনও মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, নদীটি খননও ড্রেজিং করলে নৌচলাচল সম্ভব। এতে উপজেলা নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পাবে। আর গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হকের ভাষ্য, নদী ড্রেজিং, খনন ও গতিপথ পরিবর্তন করা সরকারের ওপর মহলের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে ভাঙন রোধে পাউবো কাজ করছে।

নদীপারের বাসিন্দা উপজেলা পরিষদের চেয়াম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম সরকারের বাড়িও কয়েক দফা ভাঙনের কবলে পড়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত তিস্তার সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে ড্রেজিং হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, এ কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

সংসদের প্রথম অধিবেশনে নদীভাঙন নিয়ে কথা বলেছেন স্থানীয় এমপি আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগার। তিনি বলেন, ভাঙন রোধসহ বিভিন্ন রুটে নৌচলাচল চালু করতে ড্রেজিং এবং সংরক্ষণের বিকল্প নেই।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়