৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ - ১৮ মে, ২০২৪ - 18 May, 2024
amader protidin

অব্যাহত তাপদাহ : ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় লিচুখ্যাত দিনাজপুরের লিচু চাষীরা

আমাদের প্রতিদিন
4 weeks ago
134


অব্যাহত অনাবৃষ্টি আর তাপদাহে পুড়ে যাচ্ছে লিচুর মকুল, ঝরে পড়ছে গাছের গুটি

দিনাজপুর প্রতিনিধি:

মুকুল থেকে গুটি আসার সময় অব্যাহত অনাবৃষ্টি আর তাপদাহের কারনে পুড়ে যাচ্ছে লিচুর মুকুল, ঝরে পড়ছে লিচুর গুটি। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণে চরম দুশ্চিন্তায় লিচুখ্যাত দিনাজপুরের লিচু চাষীরা। এই অবস্থায় লিচুর বাগানে সেচসহ বিভিন্ন পরিচর্যা করে গাছের লিচু রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়ার প্রতিকুল এই অবস্থা মোকাবেলা করে গাছের লিচু রক্ষায় চাষীদের সব ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

‘আম লিচুতে ভরপুর—জেলা মোদের দিনাজপুর’। ধানের জেলা হিসেবে পরিচিত এই দিনাজপুরে ইতিমধ্যে লিচুর জন্যও বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। ইতিমধ্যে দিনাজপুরের সুস্বাদু লিচুর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। লিচুখ্যাত এই দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লিচুগাছগুলোতে এবার সমারোহ ঘটে ব্যাপক মুকুলের। আর এসব মুকুল থেকে চৈত্র মাসের শেষ দিক থেকেই আসতে শুরু করে গুটি। কিন্তু গুটি হওয়ার এই সময়ে অব্যাহত তাপদাহ আর অনাবৃষ্টির কারনে পুড়ে যাচ্ছে গাছের মুকুল, ঝরে পড়ছে নতুন গুটি। এতে প্রথম অবস্থায় গাছের মুকল দেখে বেশ আশান্বিত হলেও এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দিনাজপুরের লিচু চাষীরা। ফলন নিয়ে এখন আশাহত হয়ে পড়েছেন তারা।

দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর খোয়াড়ের মোড় এলাকার লিচু চাষী জাকির হোসেন বলেন, তার বাগানে ছোটবড় মিলিয়ে শতাধিক লিচুর গাছ রয়েছে। প্রথম অবস্থায় প্রায় প্রতিটি গাছেই ব্যাপক মুকুল আসায় এবার লিচু নিয়ে বেশ লাভের স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু গুটি আসার মোক্ষম সময়ে তীব্র রোদ আর গরমের কারনে পুড়ে গেছে গাছের অনেক মুকুল এবং এখন ঝরে পড়ছে লিচুর গুটি। এই অবস্থায় ফলন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

পাশের আরেক লিচু চাষী জানান, মাদ্রাজী ও বোম্বে জাতের লিচু গাছে এবার ব্যাপক মুকুল আসে। বর্তমানে বিরূপ আবহাওয়ার কারনে বোম্বে লিচুর গাছে মোটামুটি ভালো গুটি থাকলেও মাদ্রাজী জাতের লিচুর গাছের বেশীরভাগ মুকুল রোদে পুড়ে গেছে।

দিনাজপুরে লিচুর গ্রাম হিসেবে পরিচিত বিরল উপজেলার মাধববাটী। এই গ্রামের লিচুচাষী আনারুল ইসলাম বলেন, লিচুকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের হাজারও মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। কিন্তু প্রকৃতির এই বিরূপ আচরনে এবার লিচুর ফলন নিয়ে শংকায় তারা। একই গ্রামের লিচু চাষী কালাম হোসেন জানান, প্রতিকুল এই আবহাওয়ার কারনে এবার লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হবে। লিচু রক্ষায় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিচ্ছেন বলেও জানালেন তিনি।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিচুর মুকুল থেকে গুটি আসার সময় সাধারণত তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে লিচুর ফলনের জন্য বেশ ভালো। কিন্তু দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষনাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, দিনাজপুরে এক সপ্তাহেরও বেশী সময় ধরে তাপমাত্রা বিরাজ করছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত কয়েকদিনের তুলনায় শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) তাপমাত্রা একটু কমে আসলেও রেকর্ড করা হয়েছে ৩৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে বিরূপ এই আবহাওয়ার মধ্যেও বসে নেই দিনাজপুরের লিচু চাষীরা। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করে গাছের লিচু রক্ষায় বাগানে সেচ ও গাছের বিভিন্ন পরিচর্যা করছেন তারা। শুক্রবার লিচু অধ্যুষিত এলাকা দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মাধববাটী,  সদর উপজেলার মাসিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লিচুর বাগানে শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিচ্ছেন লিচু চাষীরা। সদর উপজেলার মাসিমপুর গ্রামের লিচুচাষী জাকির হোসেন বললেন, সেচ দিতে বাড়তি খরচ হলেও এখন এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। প্রতিকুল এই আবহাওয়া মোকাবেলা করে যেটুকু ফলন আসবে—সেটুকুই লাভ।

দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ—সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেন, লিচুগাছে এবার প্রচুর মুকুল আসার পরও বৈরী আবহাওয়ার কারনে কিছু মুকুল ঝরে গেছে। তারপরও এখন দানা পর্যায়ে চলে এসেছে। সেক্ষেত্রে আমরা চাষী পর্যায়ে বলছি—এটা একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা যদি সঠিকভাবে সেচ দেয়, সঠিকভাবে ওষুধ প্রয়োগ করে—তাহলে এই লিচুকে আমরা হারভেস্ট পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবো এবং আমরা পর্যাপ্ত ফলন পাবো।

লিচু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরের বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তফা হাসান ইমাম বলেন, প্রতিকুল এই আবহাওয়া মোকাবেলা করে লিচুর ফলন রক্ষায় আমরা সার্বক্ষনিক লিচুচাষীদের পরামর্শ দিয়ে আসছি। এ জন্য চাষীদের তিনি বিকেলে বা সন্ধ্যায় লিচুগাছে নিয়মিত সেচ এবং বোরণ স্প্রে করার পরামর্শ দেন। তবে তিনি জানান, কৃষিবিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষকরা যেভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে—তাতে লিচুর ফলনের বেশী ক্ষতি হবে না।

উল্লেখ্য, দিনাজপুর জেলায় বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজার হেক্টরেরও বেশী জমিতে লিচুর গাছ রয়েছে। দিনাজপুরের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই সরবরাহ করা হয় দিনাজপুরের লিচু।

 

 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়