১ আষাঢ়, ১৪৩১ - ১৫ জুন, ২০২৪ - 15 June, 2024
amader protidin

পীরগঞ্জে ২ দিন পর পুকুরে নিখোঁজ শিশুর লাশ মিললো অভিযুক্ত শিল্পী নামের মহিলাকে গ্রেফতার

আমাদের প্রতিদিন
5 days ago
49


পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধিঃ

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মিঠিপুর ইউনিয়নের মাদারগঞ্জ হাটের পশ্চিমে একবারপুর দক্ষিণপাড়ায় নিখোঁজের ৩৪ ঘন্টা পর ৪ বছরের শিশু আদম মিয়ার লাশ পুকুরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গেছে।  এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে প্রতিবেশি মোকসেদ আলীর স্ত্রী শিল্পী(৪০)কে আটক করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে পুকুরে লাশ ভেসে উঠার পরই তুলকালাম ঘটনা ঘটে। লাশ ভেসে উঠার পরই উৎসুক জনতার ভীড় বাড়তে থাকে। এ সময় নিহত শিশুর পরিবার দাবি করেন, পুর্ব শক্রতার জের ধরে নিখোঁজ শিশুটিতে হত্যার পর লাশ পুকুরে ফেলে দিয়েছে প্রতিবেশি মোকসেদ আলী ও তার স্ত্রী শিল্পী বেগম। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে ঘটনাস্থলে আগত আশে পাশের গ্রামের লোকজন । অভিযুক্ত’র বাড়িতে ইট পাটকেল নিক্ষেপ, বাড়ি ভাংচুর, নির্যাতনসহ বিক্ষুপ্ত জনতার রোষানল থেকে বাচাঁতে পুলিশ বাঁধা দিলে জনতা উল্টো পুলিশের উপরে চড়াও হয়। এক পর্যায়ে পুলিশের উপরে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে সংঘবদ্ধ জনতা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১১ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ৩ রাউন্ড টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। দফায় দফায় জনতা ও পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। শনিবার রাত ১১টা থেকে গতকাল রোববার ভোর রাত পর্যন্ত এ ঘটনা চলতে থাকে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা ইতোমধ্য ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়েছেন। লাশ মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিল্পী বেগমকে গ্রেফতার করা হলেও স্বামী মোকসেদ আলী পলাতক রয়েছে।

পুলিশের ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের আযানের পরই নিখোঁজ হয় মাদারগঞ্জ হাটের নাইট গার্ড একবারপুর দক্ষিণপাড়া গ্রমের জাকারিয়া মিয়ার ৪ বছরের একমাত্র ছেলে শিশু সন্তান আদম মিয়া। নিখোঁজের পরই পরিবার ও আত্বীয় স্বজনরা বিভিন্ন জায়গায় আদমের খোঁজ করতে থাকে।

গত শনিবার রাতে আদমের নিকট আত্বীয়দের কয়েকজন মহিলা সন্দেহজনকভাবে প্রতিবেশি মোকসেদ ও শিল্পীর বাড়ি ঘরে তল্লাশি চালায়। এ সময় ব্যবহৃত বড় একটি ওয়ার ড্রপের কয়েকটি ডয়ার খোলা দেখলেও ১টি ড্রয়ার তালাবন্ধ দেখতে পায়। ওয়ার ড্রপের তালাবন্ধ ডয়ারটি দেখতে চাইলে মোকসেদ ও শিল্পী জানায় এই ডয়ারের চাবি নেই। উক্ত ডয়ার দেখতে না পেয়ে মহিলাদের সন্দেহ ঘনীভুত হয়। তারা বাড়ির পুরুষদের ডাকতে বাড়িতে ফিরে যায়। পুরুষ ও মহিলারা সম্মিলিতভাবে আবারও ওই বাড়িতে গিয়ে তালাবদ্ধ ডয়ার খোলা দেখতে পায়। এ সময় উভয়ের মধ্য তর্কবিতর্ক হয়। শিল্পী ও মোকসেদের বাড়ী থেকে ফিরে যাবার পথে আইলে (সরু সড়ক) নিখোঁজ আদমের জুতা দেখতে পায়। তখন সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে। এর কিছুসময় পরেই রাত আনুমানিক ১১ টার দিকে মোকসেদ ও শিল্পীর বাড়ির সন্নিকটে মৃত আব্দুর জব্বারের ছেলে রানজু মিয়ার পুকুরে নিখোঁজ শিশুর ভাসমান লাশের দেখা মেলে।  খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়।

মুহুর্তে এ ঘটনা জানাজানি হলে মাদারগঞ্জ হাটে থাকা শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। শনি ও বুধবার সপ্তাহে ২দিন মাদারগঞ্জে হাট বসে। শনিবার হাটের দিন থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যই হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। রাত সাড়ে ১২ টার দিকে শিশুর লাশ পুকুর থেকে থানা হেফাজতে নিয়ে আসা হয়। শিশুর পরিবারের অভিযোগে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে জনতা। জনতা মোকসেদ ও শিল্পীর বাড়ীতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে এবং বাড়ি ভাংচুরে উত্তক্ত হয়। এ সময় পুলিশ বাঁধা প্রদান করে। ইতোমধ্য সেখানে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়।

পুলিশি বাঁধা পেয়ে ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে উপস্থিত জনতা। তারা পুলিশের উপরে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। সে সময়ে রংপুর পুলিশ লাইন থেকে দাঙ্গা পুলিশ আসলে শতাধিক পুলিশের উপস্থিতিতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে কয়েক দফা পুলিশ ও জনতার মধ্য ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১১ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ৩ রাউন্ড টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। অভিযুক্ত শিল্পী বেগমকে আটক করে থানা হেফাজতে আনা হয়। লাশ ও শিউলি বেগমকে থানা হেফাজতে আনার পর রাত ২ টার দিকে জনতার রোষানলে পড়ে পুলিশ। ভোররাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

উল্লেখ্য, শিউলী বেগম দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে আসল স্বর্ণালংকারের  লোভ দেখিয়ে নকল স্বর্ণালংকার দিয়ে ধোকা দিয়ে টাকা রোজগার করে আসছে। সে প্রথমে একই গ্রামের কুখ্যাত শাহিন চোরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। সে সময়ে ২০১২ সালে একই গ্রামের ফেরদৌসের ১৩ বছরের শিশু ফারজানা হত্যার সাথে এই শিল্পী ও তখনকার স্বামী শাহিন চোর। পরে শাহীন চোরকে তালাক দিয়ে মোকসেদ আলীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় শিল্পী বেগম। স্বামী মোকসেদ কর্মহীন হলেও স্ত্রীর রোজগারে স্বচ্ছল জীবন যাপন তাদের।

মিঠিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফরহাদ মন্ডল জানান, হাটবারের কারনে উৎসুক জনতার ভীড় বাড়ে, শিল্পী’র সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারনা খারাপ। শিল্পীর নামে একই গ্রামের আগের একটি শিশু হত্যা মামলা রয়েছে।

সহকারী পুলিশ সুপার ডি-সার্কেল (পীরগঞ্জ-মিঠাপুকুর) জানান, খবর পেয়ে গভীর রাতে অতিরিক্ত পুলিশসহ ঘটনাস্থলে আসি। রাত আনুমানিক ২ টা থেকে আড়াইটার দিকে উপস্থিত জনতা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। উত্তেজিত জনতা লাশের পরিবর্তে লাশ চাই শ্লোগান দিচ্ছিল, অভিযুক্তদের বাড়িতে ইট-পাটকেল ও ভাংচুর করে তাদের হত্যা করতে উত্তক্ত হয়। উত্তেজিত জনতাকে থামাতে গেলে উল্টো পুলিশের উপরে আক্রমন করা হয়। জনতার ইট-পাটকেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। লাঠিচার্জের ঘটনা না ঘটলেও রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল নিক্ষেপে ধাওয়া দেয়া হয়। বর্তমানে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওসি আনোয়ারুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় শিশুর বাবা জাকারিয়া স্বামী মোকসেদ আলী ও তার স্ত্রী শিল্পী বেগমের নামে হত্যা মামলা রুজু করেছে। শিল্পীকে ইতোমধ্য গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কড়া পুলিশ প্রহরায় ময়না তদন্ত থেকে ফিরে আসা শিশুর লাশ দাফনে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়