৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ - ২১ মে, ২০২৬ - 21 May, 2026

দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা

আমাদের প্রতিদিন
393
2024-10-28 01:52:19

news-picture

দিনাজপুর প্রতিনিধি:

চিকিৎসক সংকট, পরীক্ষানীরিক্ষার অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিকল, শয্যা সংকটসহ নানান সমস্যায় জর্জরিত দিনাজপুরের এম. আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। সব মিলিয়ে এখন যেনো নিজেই রোগী হয়ে পড়েছে দিনাজপুরসহ এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র আশ্রয়স্থল এই হাসপাতালটি। দুরদুরান্ত থেকে এসে রোগীরা এই হাসপাতালে ভর্তি হলেও পাচ্ছেন না কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা। এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েও পরীক্ষা—নীরিক্ষার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারী ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর উপর।

১৯৯২ সালে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মান হলে ২০০৬ সালে শুরু হয় স্বাস্থ্যসেবা। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে পরবর্তীতে নামকরন করা হয় এম. আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

খেঁাজ নিয়ে জানাগেছে, দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী এখানে চিকিৎসকদের অনুমোদিত পদ ২১২টি। সেখানে কর্মরত আছেন ১১১জন। সেই হিসেবে চিকিৎসকের ১০১টি পদই শুন্য। এদের মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্টর ১২ জনের স্থলে কর্মরত রয়েছে ৫ জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট ৮ জনের স্থলে ৩ জন, আবাসিক সার্জন ১৩ জনের স্থলে ৯ জন, বিভিন্ন বিষয়ে রেজিস্ট্রার ও সহকারি রেজিস্ট্রার চিকিৎসক ৭০ জনের স্থলে ৩১ জন এবং অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ১৫ জনের স্থলে মাত্র ১জন, মেডিকেল অফিসার ৫০ পদের স্থলে কর্মরত রয়েছেন ৪৩ জন। এছাড়াও দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেনীর ১৩৩ পদের বিপরীতে ৬৫টি পদ শুন্য রয়েছে।

হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ নিউরো সার্জারি। এর চিকিৎসা ব্যয়বহুল হলেও উত্তরাঞ্চলের মানুষদের ভরসাস্থল হয়েছিল এই হাসপাতাল। নিউরো সার্জারি রোগীদের পৃথক ওয়ার্ড না থাকায় হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় সাধারন সার্জারি ওয়ার্ডেই রাখা হয়েছে রোগীদের। প্রতিদিন গড়ে নিউরো সার্জারী রোগী ভর্তি থাকেন ২০—২৫ জন। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে হাসপাতালে চালু হয় নিউরো সার্জারি অস্ত্রপচার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১জন চিকিৎসক দিয়েই চলছে নিউরো সার্জারি বিভাগ। হাসপাতালের একমাত্র নিউরো সার্জারি বিশেষজ্ঞ সারোয়ার মোর্শেদ আলম জানান, সপ্তাহে দুইদিন অস্ত্রপচার করা হয়। শুরু থেকে একজন চিকিৎসক দিয়েই চলছে বিভাগটি। এক্ষেত্রে সার্জারি ওয়ার্ডের চিকিৎসক ও ইন্টার্ণি চিকিৎসকদের সহায়তা নিয়ে চালাচ্ছি। এরইমধ্যে কোমড়ের হাড়ের অস্ত্রপচারের গুরুত্বপূর্ণ সি—আর্ম মেশিনটিসহ কয়েকটি মেশিন বিকল হয়ে আছে। ফলে কিছু রোগীকে ফেরত পাঠাতে হচ্ছে।

রোগীদের পরীক্ষা—নীরিক্ষার জন্য হাসপাতালের অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এম.আর.আই মেশিনসহ হাসপাতালের মোট ছোট—বড় মিলিয়ে ৫৫৫টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ২৫৭টিই অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের পরীক্ষা—নীরিক্ষার জন্য যেতে হয় বাইরের বেসরকারী ডায়গনস্টিক সেন্টারগুলোতে। সরকারীভাবে চিকিৎসাসেবা নিতে এসেও বাড়তি টাকা খরচ হয় বাইরে পরীক্ষা—নীরিক্ষার কাজে। ইতিপুর্বে অভিযোগ ওঠে—হাসপাতালের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা—কর্মচারী বেসরকারী ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর স্বার্থেই মেশিনগুলো খারাপ করে রেখেছে।

 

হাসপাতালে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে খেঁাজ নিয়ে জানাযায়, পরিত্যাক্ত অবস্থায় আছে এম.আর.আই যন্ত্রটি। দীর্ঘদিন অচল থাকায় প্রিটার, কম্পিউটারসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশগুলো অচলাবস্থায়। সিটি স্ক্যান যন্ত্রটিও নষ্ট ছিলো প্রায় দুই বছর। সম্প্রতি মেরামত করা হলেও ফিল্ম না থাকায় সিটি স্ক্যানও বন্ধ। রোগীরা এসে ঘুরে যাচ্ছেন।

হাসপাতালের এমআরআই মেশিনটি পরিচালনা করতেন গোপেশ চন্দ্র সরকার। তিনি জানান, ফিলিপস কোম্পানির এমআরআই মেশিনটি লেক্সিকন নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সালে হাসপাতালে স্থাপন করে। প্রায় ৩ বছর ঠিকঠাক চললে পরবর্তীতে যন্ত্রটির হিলিয়াম লেভেল কমে যায়। কোম্পানী থেকে বেশ কয়েকবার টেকনিশিয়ান আসলেও আর ঠিক হয়নি। তারপর থেকেই পড়ে আছে। সরকারি হাসপাতালে এই যন্ত্রে শরীরের যেকোন একটি অঙ্গ ৩ হাজার টাকার মধ্যে এমআরআই সুবিধা পেতো রোগীরা।

হাসপাতালে সপ্তাহের ছয়দিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা—নিরীক্ষা করা হয়। অন্যান্য পরীক্ষা—নিরীক্ষার সময় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা। হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ রোগীদের শয্যার পাশে রাখা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা—নীরিক্ষার রিপোর্ট। কয়েকজন চিকিৎসক—নার্স জানান, বর্তমানে কিছু প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা—নীরিক্ষা, ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম ছাড়া অন্য কোন পরীক্ষা—নীরিক্ষা হয়না। প্রায় ২৪ ঘন্টা হাসপাতালের করিডোর ও ওয়ার্ডে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা থাকেন। কিছু ওয়ার্ডবয়ের সহযোগিতা নিয়ে রোগীদেরকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান এই প্রতিনিধিরা। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি পরীক্ষা—নীরিক্ষায় সরকারি হাসপাতালের চাইতে দ্বিগুনেরও বেশী টাকা গুনতে হয় রোগীদের।

মাথা ও ঘার ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জাহাঙ্গীর আলম (৬২) নামে এক রোগী জানান, হাসপাতালের এম.আর.আই যন্ত্রটি অচল থাকায় স্থানীয় একটি বেসরকারী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এম.আর.আই করাতে খরচ হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। এখানে হলে তার ৩ হাজার টাকাতেই হতো।

নানান সমস্যায় জর্জরিত হওয়ার পরও উপায়ন্তর না পেয়ে আস্থার একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে এই হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে আসছেন দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়সহ আশেপাশের জেলার রোগীরা। এতে শয্যা না পেয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০টি থাকলেও প্রতিদিন গড়ে রোগী ভর্তি থাকেন ৯’শ থেকে ১১’শ জন। ফলে অনেক রোগীকেই চিকিৎসাসেবা নিতে থাকতে হচ্ছে মেঝেতে। 

এসব বিষয়ে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এটিএম নুরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, সারাদেশে প্রান্তিক হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকট আছে। বিষয়টি মন্ত্রনালয় অবগত। হাসপাতালের এমআরআই যন্ত্রটি পুরোপুরি অচল। সম্প্রতি সিটি স্ক্যান যন্ত্রটি মেরামত করা হয়েছে। অচল যন্ত্রপাতির তালিকা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে নির্ধারিত বেডের চেয়ে দ্বিগুন রোগী থাকে। হাসপাতালের চতুর্থ তলা সম্প্রসারনের কাজ চলছে। মেয়াদ শেষ হলেও গণপূর্ত বিভাগ হস্তান্তর করতে পারেনি। সেটি চালু হলে শয্যা সংকট কেটে যাবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়