রংপুর-১ আসনে জমে উঠেছে বিএনপি–জামায়াতের লড়াই শক্ত অবস্থান গড়তে মরিয়া ইসলামী আন্দোলন
নির্মল রায়:
রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া উপজেলা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের ১–৯ নম্বর ওয়ার্ড) আসনে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। প্রতীক বরাদ্দের পর মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এ দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠলেও নিয়মিত গণসংযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি এই আসনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক সভা-সমাবেশ, সাংগঠনিক বৈঠক এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে মাঠ চাঙা রাখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপি প্রার্থী মো. মোকাররম হোসেন সুজনের পক্ষে তুলে ধরা হচ্ছে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি ও এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা।
চারবারের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেন সুজন এলাকায় একজন পরিচিত মুখ। স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জনবান্ধব মানুষ হিসেবে পরিচিত। কোলকোন্দের সালাম মিয়া, নিয়ামত কুকরুল এলাকার তরুণ ভোটার নাঈম, গজঘটার জাফর আলী ও আলমবিদিতরের সাইফুল বলেন, সব শ্রেণী পেশার মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার গুণই সুজনের শক্তি। এবার ধানের শীষেই ভোট দেব।
এদিকে বিএনপি জোটের শরিক গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. হানিফুর রহমান সজীব মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করায় এই আসনে বিএনপির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও এই আসনে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। দলটির প্রার্থী মো. রায়হান সিরাজী শুরু থেকেই মাঠে সক্রিয় থাকায় এলাকায় তার পরিচিতি বেড়েছে। জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। নোহালীর জমিয়ার, গঙ্গাচড়ার তাজরুল ও গজঘণ্টার রহিম বলেন,
অতীতে জামায়াতের ওপর দমন-পীড়ন হয়েছে। মানুষ সেই অন্যায় দেখেছে। এবার ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবে।
কোলকোন্দ ইউনিয়নের চর চিলাখাল এলাকার ভোটার সাজু মিয়া বলেন,
এর আগে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির এমপি দেখেছি। এবার দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে জামায়াতের রাষ্ট্র পরিচালনা দেখতে চাই।
নোহালীর রামচন্দ্র বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক থাকলে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দমত প্রার্থীকে ভোট দেব।
জামায়াত জোটের শরিক এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে রায়হান সিরাজীর পক্ষে মাঠে কাজ করছেন।
এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিয়মিত পথসভা, গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। দলটির প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা বাবু আগেভাগেই এলাকায় প্রচার শুরু করেছেন। উপজেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা ইউনুস আলী বলেন,
মানুষ দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। আমরা ইনসাফভিত্তিক রাজনীতির কথা বলছি। হাতপাখা চমক দেখাবে
এ ছাড়া ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে মো. আনাস (চেয়ার প্রতীক) এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) থেকে আহসানুল আরেফিন (কাঁচি প্রতীক) এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
উল্লেখ্য, রংপুর-১ আসন দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। এরশাদ সরকারের সময় থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাই নির্বাচিত হন। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দলটি ‘বিনা ভোটের এমপি’ বিতর্কে পড়ে এবং সর্বশেষ নির্বাচনে পরাজিত হয়। চলতি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা আদালতের আদেশে বাতিল হওয়ায় ত্রিমুখী লড়াই এখন কার্যত দ্বিমুখীতে রূপ নিয়েছে।
এবিষয়ে গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস ছবুর বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং যে কোনো বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার বলেন,
জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পাঁচ স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, এছাড়া ভোটকেন্দ্র গুলোতে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সবাইকে আইন মেনে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২৪ হাজার ৩১২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ২৩ হাজার ১৭১ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন।