২৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩ - ১০ আগস্ট, ২০২৬ - 10 August, 2026

সড়ক খুঁড়ে লাপাত্তা ঠিকাদার, জনদুর্ভোগে পথচারী !

155
2026-07-20 17:23:13

news-picture

আসাদুজ্জামান সাজু, লালমনিরহাট:

সংস্কার কাজ শুরু করতে সড়ক খুঁড়ে কাজ ফেলে পালানো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দফায় দফায় চিঠি দিয়েও কাজে ফেরাতে পারছে না প্রকৌশল দপ্তর। বর্ষায় খুঁড়ে রাখা এই সড়কে সৃষ্টি হয়েছে চরম জনদুর্ভোগ।

জানা গেছে, লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, ভাদাই ও পলাশী ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ মহিষখোচা-বুড়িরহাট জেসি সড়ক (নং ১৫২০২২০০১)। প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় খানাখন্দে ভরে যায়। পথচারীসহ স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তর (এলজিইডি)।

সড়কটির সংস্কারকাজ বাস্তবায়নে দরপত্র আহ্বান করা হলে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজ পায় লালমনিরহাট সদর উপজেলার ভোলার চওড়া এলাকার ‘মেসার্স শাকিল ট্রেডার্স’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

নিয়মানুযায়ী দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ঠিকাদারের সাথে গত ১২ জানুয়ারি চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করে লালমনিরহাট স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তর। চুক্তি মোতাবেক ১৮ জানুয়ারি সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু করে ২৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। চুক্তি অনুযায়ী সংস্কারকাজ শুরু করে সড়কটি খুঁড়ে এবং গাইডওয়াল নির্মাণ করে প্রায় ২০ শতাংশ কাজের প্রথম বিল হিসেবে ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন করার পর কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

সড়কটি খুঁড়ে ফেলে রাখার ছয় মাস পার হলেও পুনরায় কাজ শুরু করা হয়নি। ফলে বর্ষার বৃষ্টিতে সড়কটি ভেঙে নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। জনদুর্ভোগ লাঘব ও এলজিইডির সুনাম রক্ষায় কয়েক দফায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েও কাজে ফেরাতে পারেনি স্থানীয় প্রকৌশল দপ্তর। এখন সড়কটির সংস্কার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, সড়ক সংস্কারের এই কাজটি ১১ শতাংশ লাভে মেসার্স শাকিল ট্রেডার্সের কাছ থেকে ক্রয় করে কাজ শুরু করেছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতির ভাই আলম। তবে ১১ শতাংশ লাভে কিনে কাজ করলে লোকসান হবে এমন আশঙ্কায় কাজ ফেলে পালিয়েছেন ওই সাব-ঠিকাদার। ফলে এলজিইডির কোনো চিঠির জবাব দিচ্ছে না মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শাকিল ট্রেডার্স। এতে করে কাজটি বাস্তবায়ন করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বর্ষার বৃষ্টিতে সড়কটির অধিকাংশ স্থান ভেঙে যাওয়ায় প্রতিদিন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় যানবাহনের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের পণ্য নষ্ট হচ্ছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করছেন পথচারীসহ স্থানীয়রা। এলাকাবাসীর দাবি, পলাতক ঠিকাদারের জামানত বাজেয়াপ্ত করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে যেন দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হয়।

স্কুলছাত্রী সাদিয়া জাহান মনি বলে, “প্রতিদিন অটোরিকশায় এই পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। অটোরিকশায় উঠলেই ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। গাড়ি এমনভাবে কাঁপে যে যেকোনো সময় গর্তে পড়ে হাত-পা ভেঙে যাওয়ার ভয় থাকে।”

পথচারী ও স্কুলশিক্ষক শাওন বলেন, “আমরা প্রায় ৩-৪ বছর খানাখন্দ পেরিয়ে এই সড়কে চলাচল করেছি। দীর্ঘ দাবির পর সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশি দিন টেকেনি। কাজ শুরুর পরেই ঠিকাদার কাজ ফেলে পালিয়েছে। এখন দুর্ভোগ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। মনে হচ্ছে আগের খানাখন্দই ভালো ছিল। তখন অন্তত কিছু জায়গা ভালো ছিল, এখন পুরো পথই চলাচলের অযোগ্য। অবিলম্বে সড়কটির দ্রুত সংস্কার চাই।”

মহিষখোচার ব্যবসায়ী ফেরদৌস আলম জানান, সড়কটি খুঁড়ে রাখায় ছয় মাস ধরে বড় ট্রাক ঢুকতে পারছে না। ফলে ছোট ট্রাকে পণ্য আনতে হচ্ছে, এতে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

কাজে যুক্ত বিএনপি নেতার ভাই আলমকে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। মূল ঠিকাদারকেও পাওয়া যায়নি।

আদিতমারী উপজেলা প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল হক বলেন, “আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করার জন্য কয়েক দফায় চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা সাড়া দিচ্ছে না। কাজ দ্রুত সমাপ্ত করতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলম জানান, জনদুর্ভোগের বিষয়টি তিনি অবগত। ব্যক্তিগতভাবে ঠিকাদারকে কার্যালয়ে ডেকে এনে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। ঠিকাদার আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় কাজ শুরু করে দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দ্রুতই এই দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়