কোটি টাকার রেসকিউ বোট নিজেই ডুবে আছে তিস্তায়
হাবিবুল হাসান হাবিব,ডিমলা (নীলফামারী)
তিস্তায় পানি বাড়লেই আতঙ্কে কাটে চরাঞ্চলের মানুষের রাত। কখনো উজানের ঢল, কখনো ভারী বর্ষণ,হঠাৎ করেই পানিবন্দী হয়ে পড়েন হাজারো মানুষ। ঘরবাড়ির পাশাপাশি পানিতে আটকা পড়ে গবাদিপশু। দুর্গম চরাঞ্চল থেকে দ্রুত মানুষ ও গবাদিপশু উদ্ধারে এমন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছিল তিনটি অত্যাধুনিক মাল্টিপারপাস রেসকিউ বোট। কিন্তু যাদের কাজ ছিল বিপদের সময় মানুষকে উদ্ধার করা, কয়েক বছর পর সেই বোটগুলোর অবস্থাই হয়েছে করুণ । নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার তিস্তাপাড়ের বিভিন্ন ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে সরকারি এসব উদ্ধারযান। ডিমলা এলাকায় একটি বোট পানিতে তলিয়ে বালুর নিচে চাপা পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্য বোটগুলোও পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায়। দীর্ঘদিন রোদ বৃষ্টিতে পড়ে থাকায় বোটগুলোর বিভিন্ন অংশে ধরেছে মরিচা। ছাদের ত্রিপল নেই, বসার সিট নেই। মূল্যবান বিভিন্ন যন্ত্রাংশও নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দীর্ঘদিন ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় বোটগুলোর ইঞ্জিনও অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে বন্যার্ত মানুষকে উদ্ধারের জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা বোটগুলোই এখন নিজেরাই যেন উদ্ধারের অপেক্ষায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি মাল্টিপারপাস রেসকিউ বোট কেনা হয়। তিস্তাপাড়ের বন্যাপ্রবণ ও দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল প্রশংসনীয়। কারণ, তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের দুর্যোগঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। নদীর পানি বাড়লে অনেক চরাঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে নৌযান ছাড়া বিকল্প থাকে না। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছর পর সেই উদ্ধারযানগুলোই যদি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তাহলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রায় তিন কোটি টাকা খরচ করে কেনা এসব বোটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার ছিল? প্রকল্প শেষ হওয়ার পর বোটগুলোর কী হবে এ নিয়ে কি কোনো স্থায়ী পরিকল্পনা ছিল? যদি পরিকল্পনা থেকেই থাকে, তাহলে কেন সেগুলো নদীর তীরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে? কোথায় গেল রক্ষণাবেক্ষণের টাকা? বোটগুলোর বর্তমান অবস্থাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ব্যয় নিয়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বোটগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি সরবরাহের জন্য বরাদ্দ থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয়নি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী, জ্বালানি ক্রয়ের হিসাব, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, চালকদের বেতন-ভাতা এবং বোটগুলোর সংরক্ষণ ব্যয়ের নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের বক্তব্য, সরকারি অর্থে কেনা সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই তো সরকারি সম্পদের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বোটগুলো এখনো সরকারি সম্পদ। তিস্তাপাড়ের মানুষও এখনো বন্যার ঝুঁকিতে।
তাহলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এসব বোটের দায়িত্ব কার? কোন দপ্তর এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করবে? বন্যার সময় কোন কর্তৃপক্ষ এগুলো পরিচালনা করবে? এগুলো সচল রাখতে প্রতি বছর কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
তিস্তাপাড়ের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বন্যার সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত সরকারি রেসকিউ বোট যদি অচল থাকে, তাহলে দুর্যোগের সময় উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষায়, যে বোট দিয়ে আমাদের বিপদের সময় উদ্ধার করার কথা, সেটাই যদি পানির নিচে পড়ে থাকে, তাহলে এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। বোটগুলো সচল থাকলে বন্যার সময় অনেক কাজে লাগত। এখন এগুলো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট হওয়া উচিত নয়। রেসকিউ বোট পরিচালনার জন্য চালকও ছিলেন। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদেরও নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বোট চালক নাহিদ আল হাসান সুমন জানান, দীর্ঘদিন বোটগুলো নিয়মিত পরিচালিত না হওয়ায় ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে চালকদের বেতন-ভাতা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, বোটকে সচল রাখতে নিয়মিত ইঞ্জিন চালু করে পরীক্ষা করা, নির্দিষ্ট সময় পরপর সার্ভিসিং এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা জরুরি।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বোটগুলো অচল হয়ে পড়ার অভিযোগের বিষয়ে নীলফামারী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ায় বোটগুলো এতদিন সচল করা সম্ভব হয়নি। বরাদ্দ পাওয়া গেলে বোটগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এ বক্তব্যে স্বস্তি মিললেও স্থানীয়দের প্রশ্ন বরাদ্দ না আসা পর্যন্ত বোটগুলো আরও নষ্ট হতে থাকবে কি না?
স্থানীয়দের মতে, নদীর পাড়ে কোনো যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় রাখলে দ্রুত ক্ষয় হয়। পানি, আর্দ্রতা, রোদ ও বৃষ্টির কারণে ধাতব অংশে মরিচা পড়ে। ইঞ্জিন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতাও কমে যায়। রেসকিউ বোটের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলো সাধারণ নৌযান নয়; দুর্যোগের সময় জরুরি উদ্ধার কাজে ব্যবহারের জন্যই তৈরি। তাই বোটগুলোকে নিরাপদ স্থানে রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন তিস্তাপাড়ের ঘাটে পড়ে থাকায় এখন এগুলো সচল করতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
বোটগুলো অচল থাকার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে তিস্তাপাড়ের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের ওপর। তিস্তার পানি বাড়লে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঁধ বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন। অনেক পরিবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু নিয়ে থাকার চেষ্টা করেন। ফলে হঠাৎ বন্যা হলে দ্রুত উদ্ধারযানের প্রয়োজন হয়। সরকারি রেসকিউ বোটগুলো সচল থাকলে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ত। কিন্তু সেগুলো যদি ইঞ্জিন বিকল অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে জরুরি মুহূর্তে বিকল্প নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের আরো দাবি, তিনটি বোটের বর্তমান অবস্থার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। কোন বোট কোথায় রয়েছে, কোনটির ইঞ্জিন সচল, কোনটির কী কী যন্ত্রাংশ নেই, কোনটি পানিতে তলিয়ে গেছে সবকিছু তদন্ত করে নথিভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বোট কেনা থেকে শুরু করে প্রকল্পের শেষ পর্যন্ত ব্যয়ের হিসাব এবং পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হওয়া অর্থের হিসাবও জনসম্মুখে আনার দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রয়োজনে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অভ্যন্তরীণ অডিট ও সরকারি নিরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্যমতে,
প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা তিনটি রেসকিউ বোটকে দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষা করা জরুরি। যেসব বোট মেরামতযোগ্য, সেগুলো দ্রুত মেরামত করে সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বোট পরিচালনার জন্য চালকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত করা, জ্বালানি বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অনেকের মতে, শুধু বরাদ্দ পেলেই হবে না বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সরকারি অর্থে কেনা হয়েছিল তিনটি অত্যাধুনিক রেসকিউ বোট। উদ্দেশ্য ছিল তিস্তাপাড়ের দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। অথচ কয়েক বছর পর সেই বোটগুলোর একটি যদি পানির নিচে বালুর চাপায় পড়ে থাকে, আর অন্যগুলো যদি মরিচা ধরে নষ্ট হতে থাকে তাহলে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে, কিন্তু তিস্তাপাড়ের মানুষের দুর্যোগ শেষ হয়নি। বন্যা আসবে, পানি বাড়বে, মানুষ পানিবন্দী হবে। তখন উদ্ধারযানের প্রয়োজন হবে। প্রশ্ন হলো,সেই সংকটের মুহূর্তে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা বোটগুলো কি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবে, নাকি নিজেদের অচলাবস্থার কারণেই পড়ে থাকবে? এখনই বোটগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের অডিট এবং দ্রুত সচল করার কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সরকারি এই মূল্যবান সম্পদ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।