৪ শ্রাবণ, ১৪৩১ - ১৯ জুলাই, ২০২৪ - 19 July, 2024
amader protidin

ভরা মৌসুমেও অধিকাংশ সময়েই বন্ধ দিনাজপুরের ১৮৮টি অটোরাইস মিল: চাল উৎপাদন ব্যহতের আশংকা

আমাদের প্রতিদিন
1 year ago
383


বিদ্যুতের অস্বাভাবিক লোডসেডিং

দিনাজপুর প্রতিনিধি:

চাল উৎপাদনের ভরা মৌসুমে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক লোডসেডিং-এর কারনে চরম বিপাকে পড়েছেন ধানের জেলা দিনাজপুরের চালকল মালিকরা। ধান সংগ্রহ করেও বিদ্যুতের অভাবে অধিকাংশ সময় মিল বন্ধ রেখে অসহায় হয়ে হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন তারা। এই অবস্থায় ধান কিনেও চাল উৎপাদন করতে না পারায় ধান কেনা একরকম বন্ধ করে দিয়েছেন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। ফলে ভরা বোরো মৌসুমেও ৩/৪ দিনের  ব্যবধানে দিনাজপুরের বাজারে বস্তা প্রতি (৭৫ কেজি) ধানের দাম কমেছে ২৫০ থেকে ৩’শ টাকা। এ নিয়ে হতাশ কৃষি নির্ভর এই জেলার কৃষকরাও।

গতকাল সোমবার (১৫ মে) দুপুরে দিনাজপুর সদর উপজেলার উত্তর গোবিন্দপুর এলাকার ‘থ্রি-স্টার’ অটোরাইস মিলে গিয়ে দেখা যায়, গোটা মিল ও মিল চত্বরে কয়েক হাজার ধানের বস্তার স্তুপ। বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ রয়েছে মিল। মিলের প্রায় ৩০ জন শ্রমিক সময় কাটাচ্ছেন শুয়ে ও বসে। কেন বসে আছেন, জিজ্ঞেস করতেই মিলের অপারেটর আশরাফুল ইসলাম বললেন, ‘আগে বসে থাকিছিনো ধানের অপেক্ষায়-আর এখন মিলত ধান ভর্তি, বসি আছি কারেন্টের (বিদ্যুৎ) অপেক্ষায়। মাঝে মাঝে কারেন্ট আসিলেও মিলের সুইচ দিতেই-একটু পরে কারেন্ট নাই। মিলটা চালায় যাছে নাই, কেমন করি কাম চলিবে?”

সহকারী অপারেটর আজিমুল হক বলেন, ‘কারেন্টের অপেক্ষায় দিন-রাত বসি থাকেছি। কামও হয়না-ঘুমও হয়না। অথচ এই সময় হামেরা কামের ফুরসৎ পাই না। এইভাবে চলিলে মালিকেরও লস, হামারও লস’।

মিল মালিক সুনন্দ বসাক জানান, একটি ড্রায়ার চালাতে প্রতিবার ধান লাগে ৩’শ বস্তা (প্রতি বস্তা ৭৫ কেজি)। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দিনে ২টি ড্রায়ারে চাল উৎপাদন করা যায়। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুতের যে অবস্থা, তাতে দু’দিনেও একটি ড্রায়ার করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, তার মিলে তার নিজের ও ব্যবসায়ীদের প্রায় ৫ হাজার বস্তা ধান পড়ে আছে। বোরো ধান বেশীরভাগ কাঁচা থাকে। ভরা এই মৌসুমে ঠিকমতো মিল চালাতে না পেরে ধানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় যেসব ব্যবসায়ী ধান কিনে চাল তৈরী করতে এসেছেন, তাদেরও লোকসান হচ্ছে-মিল মালিক হিসেবে তিনিও চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন।

সুনন্দ বসাকের মতো এই দুর্বিসহ অবস্থা দিনাজপুর জেলার ১৮৮টি অটোরাইস মিল মালিকের। বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমেও ধান কিনে বিদ্যুতের অভাবে চাল উৎপাদন করতে পারছেনা এসব মিল মালিকরা। চালের ভরা এই উৎপাদন মৌসুমে অধিকাংশ সময় মিল থাকছে বন্ধ। এ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন জানান, বিদ্যুতের অস্বাভাবিক লোডসেডিং-এর কারনে অটোরাইস মিল মালিকরা প্রধানত দুটি চরম সমস্যায় পড়েছেন। প্রথম সমস্যা হলো-তারা সময়মতো ও মানসম্পন্ন চাল উৎপাদন করতে পারছেন না। আর দ্বিতীয় সমস্যা হলো-খাদ্য বিভাগের সাথে চুক্তিবদ্ধ চাল সরবরাহ নিয়ে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অটো রাইস মিলের একটি ড্রায়ার চালু করার জন্য প্রথমেই ৬ ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে আধাঘন্টা পর পর। এতে ড্রায়ারের চাল অধিকাংশই ভেঙ্গে যাচ্ছে। ফলে মানসম্পন্ন চাল উৎপাদন ব্যহতের পাশাপাশি আর্থিকভাবে চরম লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। তিনি বলেন, কেনার সময় আমন ধান শুকনা থাকলেও বোরো ধান থাকে কাঁচা। আর এই কাঁচা বোরো ধান ক্রয় করে বেশীক্ষন রাখলেই নষ্ট হয়ে যায়। মিল ঠিকমতো চালু রাখতে না পেরে ভরা মৌসুমে ধান কিনে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। বিদ্যুতের এই অবস্থা চলতে থাকলে চলতি বোরো সংগ্রহ অভিযানে খাদ্য বিভাগের সাথে চুক্তি করেও চাল সরবরাহ নিয়ে শংকা প্রকাশ করেন তিনি। এ জন্য খাদ্য উদ্বৃত্তের এই জেলায় ভরা এই মৌসুমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবী জানান দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো সংগ্রহ অভিযানে দিনাজপুর জেলায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন চাল সরবরাহের লক্ষ্যে জেলার ১৮৮ টি অটোরাইস মিল এবং ৯৪৭টি হাস্কিং মিল চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

এদিকে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক লোডসেডিং-এর কারনে ধান ক্রয় করেও চাল উৎপাদন করতে না পারায় ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। ফলে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে বাজারে বস্তাপ্রতি (৭৫ কেজি) ধানের দাম কমেছে ২৫০ টাকা থেকে ৩’শ টাকা। গতকাল সোমবার দিনাজপুরের অন্যতম বৃহৎ ধানের বাজার সদর উপজেলার গোপালগঞ্জ ধানের হাটে গিয়ে দেখা যায়, গত ৩/৪ দিনের ব্যবধানে বিআর-২৮ ধান প্রতিবস্তা (৭৫ কেজি) ২ হাজার ৫’শ টাকা থেকে কমে ২ হাজার ২’শ টাকা, হাইব্রিড ধান ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে কমে ১ হাজার ৮’শ টাকা, জিরা-৪০ ধান ২ হাজার ৫’শ টাকা থেকে কমে ২ হাজার ২’শ টাকা এবং গোল্ডেন কাঠারী ধান ২ হাজার ৬’শ টাকা থেকে কমে ২ হাজার ৩’শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে হঠাৎ ধানের দাম কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন কৃষকরা।

গোপালগঞ্জ হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক সোহরাব হোসেন জানান, গত শুক্রবার এই হাটেই বিআর-২৮ ধান বিক্রি করেছেন প্রতিবস্তা ২ হাজার ৫’শ টাকায়। কিন্তু আজ (সোমবার) সেই একই ধান বিক্রি করতে এসে তেমন ক্রেতা ভীড়ছে না। শেষে বাধ্য হয়েই গত হাটের তুলনায় প্রতি বস্তায় ৩’শ টাকা কমে বিক্রি করেছেন ধান। হঠাৎ দাম কমে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় তিনি।

অপরদিকে বিদ্যুৎ বিভাগও স্বীকার করেছে বিদ্যুতের চরম লোডসেডিং-এর কথা। নর্দার্ণ ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানী লিমিটেড-নেসকো দেয়া তথ্য অনুযায়ী দিনাজপুরে বিদ্যুতের চাহিদা ৪৬ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ মিলছে মাত্র ২১ থেকে ২২ মেগাওয়াট। যা চাহিদার অর্ধেকেরও কম।

নেসকো দিনাজপুর ডিভিশন-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ কালাম জানান, তার এলাকায় চাহিদা ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু তিনি সরবরাহ পাচ্ছেন ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট। তাই রেশনিং পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, মিল মালিকরা তাদের সমস্যার কথা জানিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়ন হলেই নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

নেসকো দিনাজপুর ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ ফজলুর রহমান জানান, তার জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছেন ১১ মেগাওয়াট। এ জন্য বাধ্য হয়েই এলাকা ভাগ করে লোডসেডিং দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ঘুর্ণিঝড় ‘মোখা’র কারনে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা ব্যহত হচ্ছে। অচিরেই এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। 

 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়