বিএনপি’র নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বায়না দলিল ছিনতাইয়ের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রংপুরের মাহিগঞ্জ থানার বড়দরগাহাট এলাকায় এক ড্রাইভারকে জিম্মি করে ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকার জমির বায়না দলিল ছিনিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের একঝাঁক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী আলাল হোসেনকে প্রাণনাশের হুমকি, অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর ভয় এবং ‘রোলার দিয়ে পিষে মারার’ হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক স্ট্যাম্প হাতিয়ে নেওয়ার এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী আলাল হোসেন বাদী হয়ে মাহিগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তদের অব্যাহত হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ভুক্তভোগী ও তার পরিবার।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার মূল অভিযুক্তরা হলেন, রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়ন বিএনপির ৭নং ওয়ার্ড সভাপতি সামছুল আলম, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাফিউল ইসলাম রনি, রংপুর মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য তুহিন, কল্যাণী ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল রানা, ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী (হবি সর্দারের নাতি), এবং ৬নং ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য জুয়েল। এছাড়াও শামীম, শরীফুল ইসলাম সাদ্দাম এবং রংপুর প্রেসক্লাব মার্কেটের মোবাইল ব্যবসায়ী সৌরভ (পিতা: নজরুল ডাক্তার) এই চক্রের সাথে জড়িত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও সমঝোতার নামে প্রতারণা অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহিগঞ্জ বড়দরগা হাট সংলগ্ন পূর্ব ফকিরা গ্রামের ড্রাইভার আলাল হোসেন, কাউনিয়া গোড়াই এলাকার মৃত মন্টু মিয়ার ছেলে ফুল মিয়ার (৪১) মালিকানাধীন বড়দরগা বাজারস্থ সাড়ে তিন শতক জমি ক্রয়ের জন্য গত ২১ জুন, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকা প্রদান করে একটি চুক্তিনামা সম্পাদন করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে জমি রেজিস্ট্রি না দিয়ে বিক্রেতা ফুল মিয়া উল্টো অতিরিক্ত ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। আলাল অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। শর্ত ছিল ফুল মিয়া অন্যত্র জমি বিক্রি করে আলালের বায়নাকৃত পুরো টাকা ফেরত দেবেন।
কিন্তু পরবর্তীতে ফুল মিয়া জমিটি গোপনে অন্যত্র বিক্রির চেষ্টা চালালে, গত ১৯ মে পীরগাছায় সাব-রেজিস্ট্রারকে বিষয়টি জানান আলাল। রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জমির রেজিস্ট্রি কার্যক্রম স্থগিত করেন। সে সময় সেখানে বিএনপি নেতা শামছুল ও ছাত্রদল নেতা রনি উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯ মে রাতে রংপুর শহরের ইন্দ্রার মোড়স্থ স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা তুহিনের বাড়িতে বসে উক্ত টাকা তুলে দেওয়ার ‘দায়িত্ব’ নেন বিএনপি নেতা সামছুল আলম, ছাত্রদল নেতা রাফিউল ইসলাম রনি এবং তুহিন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২ জুন রাত ১১টার দিকে পাওনা টাকা তুলে দেওয়ার নাম করে আলালকে কৌশলে মুন্সিপাড়ার যুবদল নেতা রুবেলের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আলালকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। আলাল হোসেন জানান, “সেখানে আমাকে মিথ্যা অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো, রাস্তার রোলার দিয়ে পিষে ফেলা এবং চিকলির বিলে নিয়ে জবাই করার হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে আমি কাঁপতে থাকি। এরপর তারা ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকার বিপরীতে মাত্র ৮ লাখ টাকার সমঝোতার জন্য জোরপূর্বক আমার সম্মতি আদায় করে। নেতাকর্মীদের ‘চা-নাস্তা খরচ’ বাবদ আরও ২ লাখ টাকা কেটে রেখে আমাকে মাত্র ৬ লাখ টাকা দেওয়ার চূড়ান্ত হুমকি দেওয়া হয়।”
প্রাণ বাঁচাতে আলাল তখন তার ভাগিনা আইয়ুব আলীকে ফোন করে জমির মূল বায়নাপত্রটি (১০০ টাকার তিনটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প) ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি সামছুল আলমকে দিতে বলেন। আইয়ুব আলী স্ট্যাম্পগুলো শামছুল আলমের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা হাশিম ও হাসেনের সামনে শামসুল আলমের হাতে তুলে দিলে গভীর রাতে আলালকে মুক্ত করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মূল অভিযুক্ত সামছুল আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,আমি কোন হুমকি দেইনি, রাগারাগি করছে তুহিন “আমি এই লেনদেনের বিষয়ে আগে জানতাম না। আলাল নিজেই গভীর রাতে ফোন করে আমাকে ডাকে। আমি শুধু স্ট্যাম্পের জামিনদার ছিলাম। ৮ লাখ টাকার কন্টাক্ট হয়েছিল। খরচ বাদে আলালকে ৬ লাখ টাকা দেয়ার কথা। “তবে কোন প্রেসারে ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকার স্থলে আলাল ৬ লাখ টাকা মেনে নিল এমন প্রশ্নের কোনো সঠিক জবাব দিতে পারেননি তিনি।
একইভাবে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা রাফিউল ইসলাম রনি বলেন, তুহিন যাতে আলালের কোন ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য আমি গেছিলাম। আলালকে যা বলার স্বেচ্ছাসেবক দলের তুহিন ভাই বলছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য তুহিন, বলেন শামছুল, রনি আলালকে আমার কাছে নিয়ে আসছিল আমি তাদেরকে এলাকায় আপোষ মীমাংসা করে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছি।
তবে ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন সর্দার, জুয়েল, শামীম, সাগরসহ ঘটনায় জরিত কেউই বিশাল অঙ্কের এই অর্থ কমিয়ে রফাদফার চেষ্টার কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে আরেক অভিযুক্ত কল্যাণী ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল রানার মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে এবং বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ট্রলি চালক থেকে হঠাৎ বিপুল অর্থের মালিক হওয়া সামছুল আলমকে এলাকায় সবাই ‘কোপা শামছু’ নামে চেনে। ইতিপূর্বে ইয়াবাসহ ধরা পড়ে তিনি জেলও খেটেছিলেন। এলাকায় মরণনেশা ইয়াবার একছত্র নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই রয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযুক্তরা রাজনীতির অন্তরালে মাদক ব্যবসা, সেবন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। এদের ছত্রছায়ায় জমির মালিক ফুল মিয়া একই জমি দেখিয়ে অন্তত চারজনের নিকট বায়না নিয়ে প্রতারণা করেছেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের এমন গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কল্যাণী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নাজির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হালিম জানান, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। যদি আমাদের কোনো কর্মীর অপরাধের সত্যতা মেলে, তবে দলীয় ও সাংগঠনিক উপায়ে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকে দল আশ্রয় দেবে না।”
“স্থানীয় বিএনপির তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা অভিযুক্ত এই চক্রটিকে দ্রুত দল থেকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশকে সহযোগিতার দাবি জানিয়েছে। তারা মনে করেন এই চক্রটি বিএনপির সাথে থাকলে আসন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পীরগাছা উপজেলাজুড়ে বিএনপিকে বিতর্কিত হতে হবে।”
রংপুর মেট্রোপলিটন মাহিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাইদুল ইসলাম বলেন, “জমির বায়নাপত্র এবং টাকা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী আলাল হোসেন ও তার পরিবার। আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিজেদের জানমালের সুরক্ষায় তিনি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।