নারী দিবস—শুধু উদযাপন নয়, হোক কার্যকর পদক্ষেপ
১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কর্মঘণ্টা কমানোর দাবিতে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই দিবস এখনো নারী অধিকার, সমতা ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—বর্তমান সময়ে নারী দিবস অনেক ক্ষেত্রে কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দিবসটির প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এখনো নারীরা নিরাপত্তা, সম্মান ও সমান অধিকারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই দেখা যায় নারী নির্যাতন, সহিংসতা, ধর্ষণ এবং নানা ধরনের বৈষম্যের খবর। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গলা কাটা অবস্থায় একটি কন্যাশিশুর হাঁটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ইরা নামের আট বছরের শিশুটিকে স্থানীয় শ্রমিকরা উদ্ধার করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি; চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ঈদের কাপড় কিনতে গিয়ে ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের শিকার হন চার সন্তানের এক জননী। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনাও সমাজকে নাড়া দিয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে নারীর নিরাপত্তা এখনো বড় একটি প্রশ্ন হয়ে আছে। শুধু সহিংসতাই নয়, কর্মক্ষেত্রেও নারীরা অনেক ক্ষেত্রে সমান বেতন থেকে বঞ্চিত হন। গ্রামীণ নারীদের অবস্থা আরও কঠিন। শিক্ষা ও সুযোগের অভাব, কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ এবং কম মজুরিতে অধিক শ্রম—এসব যেন তাদের জীবনের নিত্য বাস্তবতা।
কখনো কখনো অর্থনৈতিক সংকট ও প্রলোভনের কারণে কিছু নারী মাদক ব্যবসার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী চক্রগুলো অধিক লাভের আশায় এবং নিরাপত্তার জন্য নারীদের ব্যবহার করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এ ধরনের মামলা হয়েছে ২২ হাজার ৪৩১টি, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল ১৭ হাজার ৫৭১টি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাত্র ১১ মাসেই প্রায় ২ হাজার ৬৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
প্রতিবছর ৮ মার্চ নারী দিবসে নানা দাবি তোলা হয়, কিন্তু বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব কমই দেখা যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। ক্ষুদ্রঋণ, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে তাদের উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। নারী কোনো বোঝা নয়; বরং সমাজ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
বর্তমানে নারীরা শিক্ষিত হচ্ছেন এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন। গ্রামীণ এলাকার অনেক নারী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছেন। তাই কুসংস্কার দূর করে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে অপরাধীরা শাস্তি পায় এবং সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনীতি থেকে অর্থনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা ইতিমধ্যেই তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তবে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
নারীকে শুধু ত্যাগের প্রতিমূর্তি হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাদের জন্য সম্মান, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা ও সক্ষমতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাই হোক আজকের অঙ্গীকার।